Fisheries Industry Bangladesh

মাছ চাষে শীর্ষ পাঁচে বাংলাদেশ

দেশের মৎস্য খাত আজ বিকাশমান। দেশের মাছের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে মৎস্য আজ রপ্তানি হচ্ছে। ‘মাছে ভাতে বাঙালী’ আজ তা প্রমাণীত সত্য । যুগযুগ ধরে আমাদের দেশের মানুষ ভাত আর মাছ খেয়ে বেড়ে উঠেছে। মাছ, ভাত ও ডাল আমাদের প্রধান খাদ্য। শিশুকাল থেকে আমরা ভাত ও মাছ দিয়ে আমাদের দুই বেলা খাদ্য আবেদন শেষ করে আসছি।
তাই প্রয়োজনের তাগিদে মাছের চাষ আমাদের দরকার হয়ে পড়েছে। গ্রামে প্রতিটি বাড়িতে কমপক্ষে একটি করে পুকুর রয়েছে। মাছের চাষের জন্য এই পুকুর। নিজেদের ইচ্ছামত নানা পদের মাছ উক্ত পুকুরে চাষ করা হয়। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে কিছু বিক্রিও করা হয়। আজ কিন্তু গ্রামে গঞ্জে বৈজ্ঞানিক উপায়ে মাছের চাষ হচ্ছে। মৎস্য খামার এখন আমাদের যুব সমাজের কর্ম সংস্থানের প্রধান খাত হিসেবে বিবেচিত।
বিশ্ব জুড়ে মৎস্য চাষ : এফএও প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিসারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’ প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৪ সালের তথ্য অনুসারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০২৪ সালে বিশ্বে মাছসহ জলজ খাতের মোট উৎপাদন রের্কড ২৩ কোটি ৫০ লক্ষ টন। এর মধ্যে ১৯ কোটি ৫০ লক্ষ টন ছিল জলজ প্রাণী এবং ৪ কোটি টন ছিল শৈবাল। এ খাতের বিক্রয়মূল্য প্রায় ৫৬ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।
বিশ্বে মিঠাপানির মাছ উৎপাদন কেন্দ্র ক্রমেই এশিয়ার দিকে আসছে। আর তাতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএ ও) তথ্য মতে, মাছসহ জলজ প্রাণী উৎপাদনে বা চাষে বিশ্বে পঞ্চম স্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। আর অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণের বাংলাদেশের ওপর ভারত ছাড়া আর কোনো দেশ নেই।

বাংলাদেশে জলজ চাষ:
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জলজ চাষের মধ্যে মৎস্য অন্যতম। কিন্তু বাংলাদেশে জলজ চাষ বলতে মৎস্য চাষকে বুজানো হয়। জলজ প্রাণী চাষে চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ভিয়েতনামের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। অন্যদিকে চাষের বাহিরে অভ্যন্তরীন যুক্ত জলাশয় থেকে জলজ প্রাণী আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আহরণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের মূলত মাছই ধরা হয়ে থাকে।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়াী দেশের মৎস্য চাষের জিডিপির ২ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে মাছ চাষে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। যা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। মৎস্য চাষে বাংলাদেশে রীতিমতো বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে। গ্রাম-গঞ্জে, শহর তলীতে মৎস্য চাষ নিয়মিত একটি সৌকিন পেশা হয়ে দাড়িয়েছে। নিয়মিত যুব সমাজ মৎস্য চাষে এগিয়ে গেছে। উপজেলা পর্যায়ে মৎস্য অধিদপ্তর স্থাপনের মাধ্যমে সরকার এই খাতকে শক্তিশালী করেছে।
এফএও এর পূর্বেকার প্রতিবেদনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ পূর্বের অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে চিংড়ি চাষে বেশ উন্নতি হয়েছে। এই খাত এখন উন্নত হয়ে চর্তুদশ স্থান থেকে তিন ধাপ এগিয়েছে।

বাংলাদেশে নতুন রের্কড:
২০২৪ সালে জলজ প্রাণী উৎপাদন নতুন রেকর্ড গড়ে ১৪ কোটি ২০ লক্ষ পৌঁছেছে। বিক্রয়মূল্য হচ্ছে- ৩৯ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। মোট উৎপাদনের ৫১ শতাংশ ছিল আহরণ এবং ৪৯ শতাংশ হচ্ছে চাষ থেকে। এ তথ্য দিয়েছে এফএও।

বিশ্বের নানা দেশে:
২০২১ সাল থেকে জলজ প্রাণী উৎপাদনে মাছ চাষীর অবদান প্রাকৃতিক মৎস্য থেকে আহরিত মাছের উৎপাদন বেড়েছে। ২০২৪ সালে বিশ্বে মোট জলজ প্রাণী উৎপাদনের ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ এসেছে মাছ থেকে, যা ২০২২ সালে ছিল ৫১ দশমিক ২ শতাংশ।
বিশ্বে মাছ উৎপাদনে সবছেয়ে এগিয়ে রয়েছে চীন। চীনে মোট জলজ খাদ্য দ্রব্য উৎপাদনে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে চাষ থেকে। বিশ্বের বেশি জলজ প্রাণী উৎপাদনের চীনের অংশ হচ্ছে ৫৬ শতাংশ, ভারতের ১২ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ৬ শতাংশ, ভিয়েতনাম ৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ ৩ শতাংশ।

মিঠা পানিতে মাছের চাষ: সারা বিশ্বে:
বিশ্বের মাছ উৎপাদন হচ্ছে ৬৩ শতাংশ মিঠা পানি থেকে। এফএওর তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে মিঠা পানির জলাশয় থেকে মাছ উৎপাদিত হয়েছে ৬ কোটি ৪০ লক্ষ টন। সামগ্রিক ও উপকূলীয় এলাকা থেকে উৎপাদিত হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লক্ষ টন। ২০২৪ সালে অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণ হয়েছে ১ কোটি ২৩ লক্ষ টন। যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
বিশ্বে অভ্যান্তরীণ জলাশয় থেকে মাছ আহরণে শীর্ষে ভারত। ২০২৪ সালে ভারতে তার পরিমাণ ২১ লক্ষ ৭৬ হাজার টন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ১৪ লক্ষ ১২ হাজার টন। যা বিশ্বের ১১ দশমিক ৫ শতাংশ মাত্র। চীনের ১১ লক্ষ ৬৩ হাজার টন। চীন এই ক্ষেত্রে তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ ইলিশ উৎপাদনে শীর্ষে। চীন তেলাপিয়া উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়ায় বাংলাদেশ তৃতীয় স্থান রয়েছে।
পৃথিবীতে মাছ চাষে বাংলাদেশ ২০২৫ মালে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। যার পরিমাণ ২৯ লক্ষ ৭৮ হাজার টন। এই ক্ষেত্রে তৃতীয় স্থানে ভারত। যার পরিমাণ ১ কোটি ২০ লক্ষ টন। শীর্ষে থাকা চীনের উৎপাদন হচ্ছে ৫ কোটি ৭৫ লক্ষ টন।


বার্ষিক মাছের চাষঃ
চীন- ৫ কোটি লক্ষ টন, ভারত- ১ কোটি ২০ লক্ষ টন, ইন্দোনেশিয়া- ৫৯ লক্ষ টন, ভিয়েতনাম- ৫৬ লক্ষ টন, বাংলাদেশ- ২৯ লক্ষ টন, বার্ষিক মাছ চাষের পরিমান ।
বার্ষিক মাছের আহরণ- ভারত- ২১ লক্ষ টন, বাংলাদেশ- ১৪ লক্ষ টন, চীন- ১১ লক্ষ টন, ভিয়েতনাম- ১০ লক্ষ টন, উগান্ডা- ৫ লক্ষ টন মাছ আহরণ করে থাকে


মাছ চাষে ভবিষ্যত উন্নতি:

এফএওর তথ্য অনুযায়ী বিশ্বে ২০২৪ সালে উৎপাদিত জলজ প্রাণীর ৮৯ শতাংশই মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২১ দশমিক ৩ শতাংশ মাছ চাষের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিপ্লব সাধিত হয়েছে। নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বাংলাদেশ এখন রপ্তানি করছে মাছ। মাছে ভাতে বাঙালী এখন তা বাস্তবায়িত হচ্ছে।

যে সকল বিষয় নজর প্রয়োজন:
১. বাংলাদেশের মাছ চাষে কিছু সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে উন্নত জাতের মাছের পোনা , মাছেরমান, উন্নত খাবারের সমস্যা রয়েছে। পোনা মাছের মূল্যও বেশি। এই সকল ক্ষেত্রে সরকারকে আরও বেশি নজর দিতে হবে। এই ক্ষেত্রে নীতি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।
২. মাছ চাষীদের বীমা সুবিধার আওতায় আনা উচিত। অনেক সময় বন্যা, সাইক্লোনে মাছ চাষীদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। সেই সকল ক্ষতি কাটিয়ে উঠার জন্য বীমা ব্যবস্থা খুবই প্রয়োজন। চাষীদেরকেও বীমা নেয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে।

৩. সরকারের প্রতিটি উপজেলায় মৎস্য কার্যালয় রয়েছে। একজন বা একাধিক অফিসারও রয়েছে। তবে তাদের কর্মক্রম তেমন ভালো না। অলস সময় না কাটিয়ে বেতন ভাতা গ্রহন করে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়ার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। তবে জনবল সংকট রয়েছে। তা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনীয় জনবল জনবল বৃদ্ধির ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।

৪. সরকারের ১২৬ টি কেন্দ্র থেকে মাছের পোনা দেয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পুরো দেশের জন্য এই সংখ্যা অনেক কম । পোনা আহরণ করার জন্য আরও বেশি কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন।
মাছের পোনা বিতরণের জন্য সকল উপজেলা পর্যায়ে ব্যবস্থা রাখা দরকার।
৫. দেশের ব্যাংক সমূহ মাছ চাষে ঋন দিয়ে থাকে। এই ক্ষেত্রে কৃষি ব্যাংক কৃষি খাতে ঋন প্রদানের জন্য ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহন করেছে। গ্রাম-গঞ্জে কৃষি ব্যাংকের শাখা রয়েছে। তবে সুদের হার বেশি। মাছ চাষে সুদের হার আরও কমিয়ে আনা দরকার। বেসরকারি ব্যাংক সমূহকে ৭ শতাংশ হারে মৎস্য চাষে ঋন দেওয়ার উদ্যোগকে আরও বেশী গতিশীল করা প্রয়োজন। মাছের উৎপাদন ও আহরণ আরও বেশী বৃদ্ধি পেলে আমরা মাছ রপ্তানি করে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবো। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল ভারী হবে। ।দেশ উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে সহজ হবে।

Abul Quasem Haider
আবুল কাসেম হায়দার

সাবেক সহ সভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ, বিজিএমইএ , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:, অষ্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তিনি আজীবন সদস্য : এশিয়াটিক সোসাইটী বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমী, চট্টগ্রাম সমিতি, সন্দ্বীপ সমিতি ঢাকা ।

লেখক সাপ্তাহিক প্যানোরামা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments