ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর ‘গরিবের ব্যাংক’ প্রবন্ধে বলেন, “দারিদ্র্য বিষয়ে আমি সম্পৃক্ত হয়েছি নীতি-নির্ধারক বা গবেষক হিসেবে বরং আমার চারপাশে দারিদ্র্যের প্রবল উপস্থিতির কারণে। চারপাশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশে শ্রেণিকক্ষে অর্থনীতির মূল্যবান তত্ত্বগুলো পড়ানো আমার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠে। আমি চাইছিলাম আমার চারপাশের মানুষগুলোর সাহায্যে কিছু একটা করতে। এখানেই আমি দেখতে পাই দরিদ্র মানুষকে টিকে থাকার জন্য অতি সামান্য অর্থ জোগাড়ে কতটা প্রানান্তকর সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়।”
“Some are born great,
Some achieve greatness and
Some have greatness thrust
Upon them.”
-William shakespeare.
আজ যারা তরুণ, যারা আগামীর ইউনূস, আগামীর আইডল তাদের অনুপ্রেরণার জন্য তাঁর জীবন গাঁথা- ২১ জুন
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্ম/১৯৪০ সালে, চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বথুয়া গ্রামে। তাঁর পিতা হাজী দুলা মিয়া সওদাগর ও মাতা সুফিয়া খাতুন। তিনি ছিলেন ১৪ ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। ভাইবোনদের পাঁচজনই মারা যায় শৈশবে। ১৯৪৭ সালে চলে আসেন চট্টগ্রাম শহরে। প্রথম পড়াশোনা গ্রামের স্কুলেই। এরপর লামাবাজার প্রাইমারি স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে পড়েছেন। এখান থেকেই এস. এস. সি পাস করেন মেধা তালিকায় ১৬তম স্থান নিয়ে।
স্কুল জীবনে স্কাউট ছিলেন। ১৯৫৫ সালে কানাডার ওয়ার্ল্ড স্কাউট জাম্বোরিতে অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনার সময় সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও অংশ নেন। নাটকে অভিনয়ের জন্য পুরস্কৃত হন।
১৯৫৭ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে। সেখান থেকেই ১৯৬০ সালে বি. এ ও ১৯৬১ সালে নেন এম. এ ডিগ্রি। গ্র্যাজুয়েশনের পর যোগ দেন অর্থনীতি ব্যুরোতে এবং গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম ও রেহমান সোবহানের অধীনে।
১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম কলেজে অর্থনীতি বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। এরপর চলে যান আমেরিকা। ১৯৬৯ সালে ভ্যানডার বিল্ট ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন। ১৯৬৯ থেকে ‘৭২ পর্যন্ত মিডল টেনিসি স্টেট ইউনির্ভার্সিটিতে অর্থনীতির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন।
এরপর বাংলাদেশে এসে অর্থনীতির প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।
১৯৭৪ সালে প্রথম ক্ষুদ্র ঋণের প্রবর্তন করেন। একই বছর প্রতিষ্ঠা করেন তেভাগা খামার এবং গ্রামীণ ব্যাংক।
১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, তখন আমেরিকায় পড়াশোনা করতেন গরিবের এই ব্যাংকার। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গড়তে সুদূর আমেরিকায় নিরলস কাজ করে গেছেন তিনি। সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের অধিকারী এই বাংলাদেশি সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশি নাগরিক কমিটি। চালু করেন বাংলাদেশ তথ্য কেন্দ্রও। আমেরিকার তৎকালীন পাকিস্তানি দূতাবাসে কর্মরত বাংলাদেশি অফিসারদের সেখান থেকে বের হবার জন্য সাহায্য করেন। সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ ডিফেন্স লিগেরও। এ দলটি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও অন্যান্য সাহায্য সহযোগিতা দিতো।
শুরুর কথাঃ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্ম ১৯৪০ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বথুয়া গ্রামে। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে এস.এস.সি পাস করেন ১৬তম স্থান নিয়ে। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে বি.এ এবং ১৯৬১ সালে এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজের অর্থনীতি বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে ভ্যানডার বিল্ট ইউনিভার্সিটি হতে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৯-১৯৭২ সাল পর্যন্ত মিডল টেনিসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির এ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন। এরপর বাংলাদেশে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে প্রথম ক্ষুদ্র ঋণের প্রবর্তন করেন। একই বছর প্রতিষ্ঠা করেন তেভাগা খামার এবং গ্রামীণ ব্যাংক। অবশেষে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক গত ১৩ অক্টোবর ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। গত কয়েক বছর যাবৎ গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন। দেশের আপামর জনসাধারণ সেই শুভ ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন অধীর আগ্রহে। অবশেষে তা বাস্তব রূপ লাভ করল। নোবেল পুরস্কার পেলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাই এটি কোন বিস্ময় নয়। বরং প্রত্যাশিত একটি প্রাপ্তি। প্রকাশ্যে যারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেনা; গর্বে তাদের বুকও ভরে গেছে।
অর্ধেক পুরস্কার গ্রামীণ ব্যাংকেরঃ মজার ব্যাপার হলো একজন অর্থনীতিবিদ হয়েও শান্তি তে নোবেল পুরস্কার পাওয়া বিশ্বে এ প্রথম। তাও গ্রামীণ ব্যাংকের মত একটি অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানকে সাথে নিয়ে। কেননা প্রথমত রাজনীতিবিদরাই এ পুরস্কার পেয়ে থাকেন। শান্তিতে নোবেল জয়ের আনন্দ আরো বাড়িয়ে তুলেছে এদেশের প্রায় ৬৬ লক্ষ নারী। এ পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে এদেশের অবলা নারী সমাজ প্রমাণ করল তারা কতটা কতটা সৎ, পরিশ্রমী এবং আত্মবিশ্বাসী। তারা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে উপযুক্ত নেতৃত্ব ও সুযোগ পেলে বিশ্বের ৩০০ কোটি নারীর মধ্যে তারাও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
গ্রামীণ ব্যাংকের ৯৪ শতাংশ মালিকানা এর নারী ঋণ গ্রহীতাদের এবং বাকীটা সরকারের। এ ব্যাংকের ১৩ সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা বোর্ড আছে। সেখানে ৯ জন সদস্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। এরা সবাই গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা সদস্য। বাকী ৪ জনের মধ্যে ৩ জনকে মনোনয়ন দেয় সরকার।
যে কারণে শান্তিতে নোবেলঃ গত কয়েক বছর যাবৎ গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূস অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন। কারণ তিনি একজন অর্থনীতিবিদ এবং গ্রামীণ ব্যাংকও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। গত বছর অর্থনীতিবিদদের সম্ভাব্য তালিকায় তার নামও ছিল এমন খবর বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশ করে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে এ বছর তাকে পুরস্কার দেয়া হলো শান্তিতে। এতে অনেকে বিস্মিতও হয়েছেন। কেননা শান্তিতে নোবেল পাওয়ার জন্য যেসব ব্যাকগ্রাউন্ড কাজ করে যেমন-রাজনৈতিক সংঘাত, হানাহানি বা যুদ্ধ নিরসনে অবদান রাখা প্রভৃতি ক্ষেত্রে ড. ইউনূসের তেমন একটা ভূমিকা খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অর্থনীতির বদলে শান্তিতে কেন নোবেল পেলেন। তবে অসলোতে নোবেল কমিটির সাইটেশানে এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। সেখানে ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচীর সব কৃতিত্বকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার অনিবার্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরো বলা হয় দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হবার জন্য জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ যদি পথের সন্ধান না পায় তা হলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেকে একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রমাণ করেছেন। শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্য অনেক দেশের কোটি কোটি মানুষের কল্যাণে তিনি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন। কোন জামানত ছাড়াই ঋণদান একটি অসম্ভব ধারণা ছিল। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রথম এবং প্রধানতম ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।
নোবেল কমিটির সাইটেশানে আরো বলা হয়, যেসব দেশে বিশেষ করে মহিলারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, সেই সব সমাজে মুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে ক্ষুদ্র ঋণের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
জোবরার সেই ৮৫৬ টাকা থেকে এখন ২৯ হাজার কোটি টাকাঃ চট্টগ্রামের একটি অখ্যাত গ্রাম জোবরা থেকে শুরু হয়েছিল ড. ইউনূসের ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচী। ১৯৭৬ সালে মাত্র ৮৫৬ টাকা দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে জোবরা গ্রামে মাত্র ৪২ জন মহিলার মধ্যে এ ঋণ বিতরণ করে গ্রামীণ ব্যাংক মডেলের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। গত ৩০ বছরে এর সদস্য সংখ্যা বেড়ে হয় প্রায় ৬৬ লাখ এবং পুঁজির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯ হাজার কোটি টাকায়। গ্রামীণ ব্যাংকের এ প্রবৃদ্ধিকে অনেকে বিস্ময়কর বলে মনে করেন। একটি মাত্র শাখা নিয়ে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে এর শাখা ২,২২৬টি।
রবীন্দ্রনাথ থেকে ড. ইউনূসঃ ২০০৬ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর এ উপমহাদেশের মোট তিন বাঙ্গালী এ মর্যাদাবান পুরস্কার পেলেন। অন্য দু’জন হলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে এবং অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল প্রদানের সময় নোবেল কমিটি তাকে অভিহিত করেছিল ভারতীয় চেতনার অনন্য অগ্রদূত হিসেবে। সাহিত্যের প্রায় সবক্ষেত্রে অতুলনীয় অবদানের জন্য তিনি সমাদৃত ছিলেন। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের কর্ম গভীরভাবে সমাদৃত হয়েছে এই বাঙ্গালী চেতনায়। তার পৈতৃক নিবাসও বাংলাদেশে। অর্থশাস্ত্রে মৌলিক অবদানের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল পাওয়ার পর তিনি এসেছিলেন বাংলাদেশে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও আজকের বাংলাদেশঃ ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রমাণ করলেন দরিদ্র মানুষের কল্যাণ তারা নিজেরা করতে পারে। আজকে বাংলাদেশে যে কয়টি সমস্যা বিরাজমান তার মধ্যে প্রধানতম সমস্যা হচ্ছে যোগ্য, সৎ ও নিষ্ঠাবান নেতৃত্বের অভাব। রাজনীতি থেকে সমাজের সর্বত্র সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাব আমরা তিলে তিলে অনুভব করছি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যোগ্য ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তার দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচী একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ লাভ করেছে। তার এ সাহসী উদ্যোগ ও নতুন দিক নির্দেশনা নোবেল জয়ের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক মুক্তি লাভের জন্য সঠিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। ফর্মূলা যতই কার্যকরী হোক যোগ্য নেতৃত্ব না হলে তা ফলপ্রসূ হয়না। তাই ড. মুহাম্মদ ইউনূস বেশ কিছুদিন ধরে বলে বেড়াচ্ছেন রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি মনে করেন রাজনৈতিক নেতা নেত্রীর গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশী। দেশের দ্বিতীয় প্রধান সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সে ব্যক্তি যিনি অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। দুর্নীতি মুক্ত সমাজ পরিচালনা তার স্বপ্ন। দারিদ্র্য মুক্তির যে স্বপ্ন তার প্রথম ধাপ তিনি পূরণ করেছেন গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেভাবে দুর্নীতি ছড়িয়ে আছে তা থেকে মুক্তির জন্য সামাজিক আন্দোলন দরকার। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সে আন্দোলনে বিশ্বাসী। তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে প্রতীয়মান হয় একজন দুর্নীতি মুক্ত মানুষ দুর্নীতি মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সবার সংঘবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে দুর্নীতি মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য সর্বপ্রথম সবার নিজেকে দুর্নীতি মুক্ত হবার শপথ নিতে হবে। আত্মবিশ্বাসী জাতি হিসেবে গড়ে উঠার প্রতীক ড. মুহাম্মদ ইউনূস : ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সবচেয়ে বড় অবদান তিনি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে উঠার স্বপ্ন দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। তার এ প্রয়াস, আমরা যে ক্ষুদ্র জাতি নই; তাই প্রমাণ করেছে। এক সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে বাংলাদেশের জিডিপিতে গ্রামীণ ব্যাংকের অবদান কত? উত্তরে তিনি বলেছিলেন মাত্র ১.৮ শতাংশ। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় অবদান এটি ৬৬ লক্ষ পরিবারকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। এমনকি যারা এক সময় ভিক্ষা করত তাদের ছেলে মেয়েরা এখন স্কুলে যাচ্ছে।
কিছুদিন আগে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক আইসিটি কনফারেন্স হয়ে গেল। বহু দেশী বিদেশী অতিথি এতে অংশ নেয়। তারা সবাই এদেশের অমিত সম্ভাবনার কথা বলেন। আর এ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন একজন যোগ্য ও চ্যাম্পিয়ন ব্যক্তির। যিনি দেশকে মালয়েশিয়ার মাহাথিরের মত প্রযুক্তি নির্ভর করে গড়ে তুলবেন। আমরা সে চ্যাম্পিয়ন মানুষকে পেয়ে গিয়েছি। গত ৩০ বছর ধরে তিনি পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত পর্যন্ত তার সুহৃদ তৈরী করেছেন। উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম সবখানে তার গ্রহণযোগ্যতা আছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন শান্তিকামী মানুষ। তিনি একজন সাহসী মানুষ। তিনি কারো প্রতি কটাক্ষ করেন না। তিনি দেশকে অকৃত্রিমভাবে ভালবাসেন। তিনি বিশ্বাস করেন অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন হওয়া উচিত। ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার কাজের মাধ্যমে গান্ধীর মত প্রমাণ করলেন অহিংসার দিন ফুরিয়ে যায়নি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের স্বপ্ন পূরণে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম এগিয়ে আসবে। তাদের নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে ও প্রমাণ করবে আমরা যোগ্য এবং আমরাও পারি।
আন্তরিক অভিনন্দন এ পথ প্রদর্শক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। তার সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে চাই। আর ড. মুহাম্মদ ইউনূসই বাংলাদেশের আগামী দিনের পথ প্রদর্শক।
The Aid forward ever increasing wealth concentration is dangerous because it theaters human progress, social cohesion, human resaves and democracy. A world in which wealth is concentrated in a few heads is also a world in which political power is controlled by a few and used by them for their own benefit.
কথাগুলো ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার লেখা বই A world of three zerosগ্রন্থে বলেছেন, (পাতা-২) সারা বিশে^ আজ এই বইটি বেশ আলোচিত। তিনটি শূন্য আজ বিশ্ব দিন দিন সমস্যা সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। উক্ত ‘থ্রি জিরো’ সমস্যার সমাধান হলে বিশ্ব সুস্থ হবে। এটি তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টা।
গ্রামীণ ব্যাংকের জনক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং Father of Microcredit তিনি বর্তমানে Father of social Business. হয়তো আবারও যদি ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পান। তা পাবেন ‘থ্রি জিরো থিওরি’ জন্য অথবা ‘সোশ্যাল বিজনেস’, নতুন এই চিন্তার জন্য। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম।
লেখালেখিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস:
ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন গবেষক, অর্থনীতিবিদ, চিন্তুক। কিন্তু সৃজনশীল লেখক নন। কিন্তু তিনি লিখেছেন অনেক। তাঁর লেখনির কয়েকটি গ্রন্থ হচ্ছে-
১. ইউনূস, মুহাম্মদ (১৯৭৪)। জোবরার তিন কৃষক।
২. মুহাম্মদ ইউনূস (১৯৭৬) কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার বিশ্বকোষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
৩. গ্রামীণ ব্যাংক, আমার মতে (১৯৯৬)
৪. দরিদ্রের জন্য ব্যাংকার ক্ষুদ্র ঋণ এবং বিশ্ব দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৯৯১)
৫. দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব তৈরি : সামাজিক ব্যবসা এবং পুজিবাদের ভবিষ্যত (২০০৭)
৬. সামাজিক ব্যবসা গড়ে তোলা : মানবতার সবচেয়ে জরুরী চাহিদা পূরণকারী নতুন ধরনের পুঁজিবাদ (২০১০)
তিন শূন্যের পৃথিবী : শূন্য দরিদ্র, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নিগমনের নতুন অর্থনীতি (২০১৭)।
সম্মাননা ও পুরস্কার
১৯৭৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় ও আন্তর্জাতিকসহ প্রায় ১৪৫টি পুরস্কার অর্জন করেন। পৃথিবীর ৭১টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন।
১৯৮৪ সালে রামোন ফ্যাগসেসে পুরস্কার ফিলিপাইন।
১৯৮৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার
১৯৯৮ সালে ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার।
২০০৬ সালে টাইম ম্যাগাজিনে শীর্ষ ১২ জনের একজন।
২০০৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রেসিডেন্সিয়াল মডেল অব ফ্রিডম পান।
২০২১ সালে অলিম্পিক লরেন পুরস্কার পান।
২০২৫ সালে চীনের শিকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।
২০২৫ এর ১৪ মে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ড. ইউনূসকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করেন।
নির্বাচিত সরকারের নিকট দায়িত্ব অর্পণ :
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তিনি ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ সকল দলের অংশমূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারের নিকট দায়িত্ব অর্পণ করে নিজ কর্মস্থলে ফিরে গিয়েছেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তারেক রহমানের নিকট দেশের দায়িত্ব হস্তান্তর করে ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে বিদায় গ্রহণ করেন।

আবুল কাসেম হায়দার
সাবেক সহ সভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ, বিজিএমইএ , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:, অষ্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
তিনি আজীবন সদস্য : এশিয়াটিক সোসাইটী বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমী, চট্টগ্রাম সমিতি, সন্দ্বীপ সমিতি ঢাকা ।
লেখক সাপ্তাহিক প্যানোরামা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।




