[Image Source: A cartoon made by Arifur Rahman in 2008]
দুর্নীতি ধারণা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ২৪ এবং অবস্থান ১৮২ দেশের মধ্যে ১৫০তম। অর্থাৎ পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক।
দুর্নীতি বাংলাদেশে আজ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। বিশেষ করে ট্রান্সপ্যারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে দুর্নীতির নানাবিধ চিত্র তুলে ধরে একে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত করেছে। দুর্নীতি যে শুধু বাংলাদেশে আছে তা নয়, পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল এবং স্বল্পোন্নত দেশের সমাজে দুর্নীতি একটি সংক্রামক ব্যাধির মতো বিস্তার লাভ করছে। দুর্নীতির মাত্রা ও কার্যকারিতায় সমাজ ও কার্যভেদে যথেষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। দুর্নীতির উপর একশ্রেণীর বিশেষজ্ঞগণ দুর্নীতিকে উন্নয়নের সহায়ক শক্তিরূপে আখ্যায়িত করেন। যেখানে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চলের সমাজ, রাজনীতি দুর্নীতির মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে সেখানে দুর্নীতি সম্পর্কে এরূপ ধারণা কৌতূহলের সৃষ্টি করে। দুর্নীতির সনাতনী ধারণায় এর সংশোধনবাদীরা দুর্নীতির মাত্রা বৃদ্ধিতে মোটেও শংকিত নন। বরং তাদের ধারণায় দুর্নীতি উন্নয়নের ধারায় ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে। গবেষক জে. এস. নাঈও মনে করেন, “বেসরকারি মূলধন গঠনে দুর্নীতির গুরুত্ব অত্যধিক। দুর্নীতির মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের যে কোনো উদ্যোগ ত্বরান্বিত হয়। ফলে বিনিয়োজিত মূলধন মুনাফা যুক্ত হয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বর্ধিত মূলধন পুনঃবিনিয়োগের মাধ্যমে আরো বৃদ্ধি পায়। এভাবে দুর্নীতি অধিক মূলধন সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।” যতই যুক্তি প্রদর্শন করা হোক না কেন, দুর্নীতি কখনো কল্যাণমূলক রাষ্ট্র সৃষ্টিতে সহায়ক হতে পারে না। বিশেষজ্ঞরা অনেক সময় বলেন, “দুর্নীতি আমলাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, মূলধন বৃদ্ধি করে প্রভৃতি ইতিবাচক দিক থাকা সত্ত্বেও দুর্নীতি কখনো কল্যাণময় হতে পারে না। আবার অনেকে বলেন, দুর্নীতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে সহায়তা করে, সমাজকল্যাণমূলক এবং সমাজ সেবামূলক তৎপরতা বৃদ্ধি করে। তারপরও দুর্নীতি কখনো মানুষের কাম্য হতে পারে না ।
দুর্নীতি (Corruption) কি : দুর্নীতিকে সংজ্ঞায়িত করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞগণ বিশেষ করে ডবি, বসকফ ও পিন্ডলিটনের মতে,By corruption, we generally mean the behaviour of person in responsible positions that betrays the substantial trust normally assigned to those position. বাংলাদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “দুর্নীতি এক ধরনের অপরাধ, কিন্তু সব ধরনের অপরাধই দুর্নীতি নয়,এর সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার, সুযোগ-সুবিধা অপব্যবহার ইত্যাদি যুক্ত।” মি. আলী আহমেদ তার Basic Principles and prac tices and Administrative Organisation; Bangladesh গ্রন্থে বলেন, “সাধারণত ক্ষমতার অপব্যবহারের কতগুলো ধরন বর্ণনার মাধ্যমে দুর্নীতিকে নির্দিষ্ট করা যায়। এক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-উৎকোচ গ্রহণ, পেশাগত ক্ষেত্রে অসাধুতার আশ্রয় গ্রহণ ইত্যাদির মাধ্যমে মহল বিশেষের স্বার্থ হাসিল করাকে দুর্নীতি বুঝায়।”
দুর্নীতি একটি সংক্রামক ব্যাধি। মানুষ বড় হবার জন্য নানাবিধ পথ ও পন্থা অবলম্বন করে। মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের ক্ষেত্রে প্রত্যেকে স্ব স্ব জায়গায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। মানুষের নীতি ও নৈতিকতা, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকে তবে কোনো মানুষই অনৈতিক কোনো কাজ করতে দ্বিধাবোধ করে না। মানুষের চলার জন্য নীতি ও আদর্শ দরকার। নীতি, আদর্শ ও কর্মসূচিকে সামনে রেখে মানুষ ধারাবাহিকভাবে বড় হতে পারে । যখন কোনো মানুষের সামনে নীতি, আদর্শ বা মূল্যবোধের দিক নির্দেশনা থাকে না, তখন তার জন্য যেকোনো অনৈতিক কাজ করা সহজ হয়। অনৈতিক কাজ করতে গিয়ে দুর্নীতির আশ্রয় নিতে হয়, পথভ্রষ্ট হতে হয়। এক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও শিষ্টাচার একজন ব্যক্তিকে দুর্নীতি থেকে মুক্ত রাখতে পারে। যখন মানুষ ক্ষমতার অপব্যবহার করে, ঘুষ-উৎকোচ গ্রহণ করে, পেশাগত ক্ষেত্রে অসাধুতা অবলম্বন করে তখন দুর্নীতি করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। আর এ কাজগুলো অন্যায়, অসামাজিক, অনৈতিক এ অনুভূতি আসে ধর্মের মূল প্রেরণা থেকে।
দুর্নীতির প্রকৃতি ও রূপ : দুর্নীতি যে শুধু বাংলাদেশে আছে তা নয়। দুর্নীতি বিশ্বের উন্নত, অনুন্নত সব দেশেই বিদ্যমান। এক্ষেত্রে দুর্নীতির স্বরূপ সব দেশে প্রায় একই রকম। দুর্নীতির কারণও প্রায় একই রকম। তবে উন্নত দেশে দুর্নীতির রূপ ও সম্প্রসারণ এবং অনুন্নত দেশে দুর্নীতির রূপ ও সম্প্রসারণে ভিন্নতা আছে। উন্নত দেশে দুর্নীতিতে জনসাধারণ যত ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় অনুন্নত দেশে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে দুর্নীতির যে নেতিবাচক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, উন্নত দেশে তেমনটি দেখা যায় না। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে দুর্নীতির কারণে সাধারণ জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় । তবে উন্নত দেশে দুর্নীতির কারণে তা হয় না। তাই দুর্নীতির ধরন ও প্রকৃতি আমাদের দেশের তুলনায় অন্যান্য দেশে ভিন্নরূপ। আমরা এ নিবন্ধে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য খাতসমূহে দুর্নীতি সম্পর্কে আলোকপাত করব। দেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। প্রখ্যাত রাষ্ট্র বিজ্ঞানী এমাজউদ্দীনের মতে, “অধিকাংশ সরকারি সংগঠনই আজ বিশৃঙ্খল, দুর্নীতি, নিয়মহীনতা, অযোগ্যতা প্রভৃতি কঠিন পীড়ায় পীড়িত।” দেশ স্বাধীন হবার পরে দেশে দুর্নীতির মাত্রা বিভিন্ন খাতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ বৃদ্ধি ঘটে ধনী ও শক্তিশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে। কারণ তারা কোনো নিয়ম মানে না। ফলে দুর্নীতি বাড়তে থাকে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্যরূপে যেসব দুর্নীতি সমাজে ক্রিয়াশীল ও ক্রমবর্ধমানরূপে এগিয়ে যাচ্ছে তা হলো :
রাজনীতি ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি এবং কর্মতৎপরতার মধ্যে স্বচ্ছতার যথেষ্ট অভাব রয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে “যার নাই নীতি সে করে রাজনীতি” এ প্রবাদই সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গণতন্ত্র চর্চার অভাবের প্রেক্ষিতে দুর্নীতি ক্রমশ গ্রাস করছে। জনগণকে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ক্ষমতাগ্রহণ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য রাজনীতিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে স্বার্থ হাসিল করা দুর্নীতির পরিচয়বাহক। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি বেড়ে গেলে রাষ্ট্র কখনো কল্যাণকর রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে না।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি : প্রশাসনিক কর্মে অবহেলা, দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করা, ঘুষগ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ প্রভৃতি দুর্নীতির পরিচয় বহন করে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাশালী শ্রেণীর দৌরাত্ম এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বল্প বেতন, পদোন্নতি সমস্যা, ভালো কাজের পুরস্কার, অন্যায়ের শাস্তি বিধান প্রভৃতি ব্যবস্থা না থাকলে প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অদক্ষতা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি : বাংলাদেশে দুর্নীতির সমূহ বিস্তার অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই ব্যাপক। অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন, সহজে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন, রাতারাতি অর্থ সম্পদের মালিক হওয়া প্রভৃতি ব্যবসায়ীদের মজুতদার, মুনাফাখোর বানিয়ে তোলে। মজুতদাররা বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে যে মুনাফা অর্জন করে তাও এক ধরনের দুর্নীতি। আমাদের সমাজে একশ্রেণীর মজুতদার, মুনাফাখোর এবং মধ্যস্বত্বভোগীরা দুর্নীতির মাধ্যমে কালো টাকার পাহাড় গড়ছে।
সামাজিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি : সামাজিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি বাংলাদেশের সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। পরিবারের সদস্যদের একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ততার অভাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, সামাজিক সংগঠনগুলোর বিভিন্ন অসামাজিক কাজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সামাজিকভাবে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক সংগঠনগুলো দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে সামাজিক ভ্রাতৃত্বও বাধাগ্রস্ত হয়।
ধর্মের আড়ালে দুর্নীতি : এ দেশের মানুষের ধর্মের প্রতি বিশ্বাস অত্যধিক। এ দেশের মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, হিন্দুসহ গারো, চাকমা, মারমা প্রভৃতি নানাবিধ উপজাতি একই সাথে বসবাস করে। প্রত্যেকে নিজের মতো করে যার যার ধর্ম পালন করে। তাই এ দেশে পীর মাশায়েখ, মসজিদ, মন্দির, মাজার প্রভৃতির সংখ্যাও বেশি। অনেক সময় তাই দেখা যায় ধর্মের নামে অধর্ম, নীতির আড়ালে দুর্নীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ধর্মের নামে নানাবিধ কর্মকা- অধর্ম ও অসামাজিক কার্যকলাপের শামিল। আমাদের দেশে ধর্মের নামে ব্যবসা, পীর ও মাজার পূজা, ধর্মের নামে আশ্বাস দিয়ে সরলপ্রাণ মানুষের সাথে ধোঁকাবাজি, জনমনে ভীতি সৃষ্টি করা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে কাজে লাগানো প্রভৃতি ধর্মীয় দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুর্নীতি : দুর্নীতির রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে দেখা যায় একজন অন্যজনকে ঠকানো, প্রতারণা করা, কাউকে উদ্ধারের জন্য ব্যবহার করা, বিবেক বর্জিত কাজে জড়িত হওয়া প্রভৃতি ব্যক্তিগত পর্যায়ের দুর্নীতি। চাকরিদানের নামে অর্থ আদায়, বিপদ মুক্তির নামে অর্থগ্রহণ প্রভৃতিও ব্যক্তিগত পর্যায়ের দুর্নীতির অন্তর্ভুক্ত।
বাংলাদেশে দুর্নীতি কারণ : বাংলাদশে দুর্নীতি বিস্তারের নানাবিধ কারণ বাধছে। এদেশে প্রধানত যেসব কারণে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারণ আমরা এখানে আলোচনা করব :
উত্তরসূরী কর্তৃক দুর্নীতির বিস্তার : উপমহাদেশ দীর্ঘদিন বৃটিশদের ছত্রছায়ায় থাকার কারণে তাদের চাতুরী, দুর্নীতি প্রভৃতি দীর্ঘসময় এ দেশের সমাজে বিরাজমান ছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পূর্বে পাকিস্তানে পশ্চিমাদের নানা দুর্নীতি সম্প্রসারণ, পশ্চিমাদের কর্তৃক শোষণ, নির্যাতনের মাধ্যমে দুর্নীতি বিস্তার লাভ করে। ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনৈতিক কাঠামো ও রাজনৈতিক হীন স্বার্থ আদায়ের লোভে বাংলাদেশের সমাজে দুর্নীতি এখনও বিরাজমান, ক্রমবর্ধমান।
নৈতিক অবক্ষয় ও শিক্ষাব্যবস্থা : আমাদের দেশে দুর্নীতির মূল কারণ দুর্বল, ভঙ্গুর ও অনৈতিক শিক্ষা ব্যবস্থা। আমাদের এ শিক্ষা ব্যবস্থা সৎ ও যোগ্য নাগরিক গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৫ বছর পরও একটি যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা কোনো সরকার জাতিকে উপহার দিতে পারেনি। ফলে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে দুর্নীতি সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করেছে। শিক্ষার মাধ্যমে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার এবং তা জীবনে ধারণের বাস্তব শিক্ষা কর্মসূচি থাকতে হবে।
দুর্নীতিমুক্ত বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অভাব ঃ বাংলাদেশের রাষ্ট্রভার পরিচালনার দায়িত্ব এ পর্যন্ত যারা গ্রহণ করেছেন তার মধ্যে গুটিকয়েক ছাড়া অনেকেই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। জাতির সামনে সৎ, নির্ভীক নেতৃত্বের অভাব দুর্নীতি বিকাশের আরেকটি কারণ। যুব সমাজ দুর্নীতিমুক্ত, সৎ, নিষ্ঠবান নেতৃত্বের অভাবের কারণে বিভিন্ন সময়ে এগিয়ে আসতে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরির্তনের পর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দুর্নীতি দমনের যে উদাহরণ স্থাপন করেছেন তার স্থায়িত্ব ছিল কম। তার তিরোধানের পর নেতৃত্বের শূন্যতা তীব্রভাবে দেখা দেয়। নেতৃত্বের শূন্যতার ফলে দুর্নীতির বিস্তার ঘটতে থাকে প্রবলভাবে।
রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের ত্রুটিযুক্ত সম্প্রসারণ : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত অবস্থান দুর্নীতি বৃদ্ধিতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। ছাত্র রাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রে মেধাসম্পন্ন ও নিবেদিত ব্যক্তিবর্গের কম অংশগ্রহণের ফলে কম মেধা ও যোগ্যতাসম্পন্ন লোক সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে। ফলে এদের দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্র কল্যাণের দিকে পরিচালিত না হয়ে দুর্নীতির শিকার হয়। তাই রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত একটি প্রশাসন উপহার দিতে দুর্নীতিমুক্ত রাজনৈতিক দল প্রয়োজন।
আইনের শাসনের অভাবে দুর্নীতি : আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবের কারণে সমাজে দুর্নীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরাধ দূরীকরণের জন্য সমাজে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কার্যতঃ দুর্নীতি দমন কমিশন থাকলেও এর পক্ষে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ ছিল না। বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সংশোধনের উপর কার্যতঃ কোনো পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে আইনগত শিথীলতা রয়েছে। আইনগতভাবে এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ না থাকায় এদেরকে দুর্নীতিতে আরো উৎসাহী করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির অসম প্রতিযোগিতা : আমাদের দেশে সাধারণত উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নি¤œ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জনগণ রয়েছে। দেশ স্বাধীন হবার পর মধ্যবিত্ত শ্রেণী দেশ পরিচালনা ও প্রশাসনে সুযোগ পায়। নীতি ও নৈতিকতার অভাবের কারণে দেশ স্বাধীন হবার পর রাতারাতি ধনী হবার অসম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। তাই যেখানে স্বাভাবিকভাবে ধনী হবার সুযোগ নেই সেখানে রাতারাতি অসৎভাবে ধনী হবার প্রবণতা দেখা দেয়। অসৎ উপায়ে ধনী হাবার প্রবণতা দেখা দেয় নীতি ও নৈতিকতার অভাবের কারণে। সমাজের একটি শ্রেণীর মাঝে এ নীতি ও নৈতিকতার অভাব লক্ষ্য করা যায়। এরা নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সমাজের সর্বত্র অন্যায় ও দুর্নীতি বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার দুর্বলতা : আমাদের দেশে দুর্নীতি বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হলো এদেশের সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো এদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে ব্যর্থ হয়েছে। ভোক্তাদের আকৃষ্ট করতে মিডিয়ায় পণ্যের মিথ্যা প্রচারণা দুর্নীতি বিস্তারে সহায়তা করেছে। প্রচার মাধ্যমগুলোতে নীতি ও নৈতিকতা বর্জিত যে নাটক, সিনেমা প্রদর্শিত হয় তাও দুর্নীতি বিস্তারে সহায়তা করে। অন্যদিকে মিডিয়াতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচারণা তেমন চোখে পড়ে না। দুর্নীতি অনৈতিক ও অসামাজিক বিধায় দুর্নীতিবাজদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করা উচিত। এ মনোভাব মিডিয়ার নেই। মিডিয়ার ইতিবাচক মনোভাবের অভাবের কারণে দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়।
দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ কিভাবে সম্ভব? : ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়। ২০০১ সালে জোট সরকারের নির্বাচনী মেনিফেস্টোর অন্যতম ছিল সন্ত্রাস নির্মূল। আজ সন্ত্রাস একটি সহনশীল পর্যায়ে এসেছে। এটি সম্ভব হয়েছে জোট সরকারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপের কারণে। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে নকল দূরীকরণে ও সন্ত্রাস নির্মূলে যে সফলতা এসেছে তেমনিভাবে সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মূলের জন্য সরকারকে কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নিতে হবে । কিন্তু বিগত স্বৈরাচার সরকার হাসিনার ১৭ বছরে দুর্নীতিতে বাংলাদেশ ডুবে গেছে। ইউনূস সরকার কিছুটা স্বস্তিতে এনেছেন। বর্তমান তারেক রহমানের সরকার দুর্নীতিতে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করেছেন। কাজ শুরু হয়েছে। আর এগুলো নতুন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
প্রত্যেকের দুর্নীতিমুক্ত হবার শপথ গ্রহণ : দুর্নীতি দমন করা শুধু সরকারের কাজ নয়। আপামর সব জনগণকে দুর্নীতি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নিজেকে মুক্ত রাখব এবং দুর্নীতি করব না এ মর্মে সবাইকে শপথ করতে হবে। সব রাজনৈতিক নেতা- কর্মীকে স্ব স্ব উদ্যোগে দুর্নীতিমুক্ত জীবন পরিচালনা করার শপথ নিতে হবে। কেননা সংশোধনই দুর্নীতি দমনের প্রথম পদক্ষেপ।
রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের কর্মসূচি : সব রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে দুর্নীতি দমনকে হাতিয়ার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একে সামাজিক ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। সব কর্মসূচির সাথে দুর্নীতি দমনের কর্মসূচি গ্রহণ করে দলের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মীদের নেতৃত্বদানের সুযোগ দিতে হবে। বিগত নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দল দুর্নীতির বিরুদ্ধে পদক্ষেপের গ্রহণের অঙ্গীকার করেছেন।
শিক্ষার মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি : প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচির মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ ও দুর্নীতিমুক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। দুর্নীতি করা অন্যায় ও এর মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ প্রচারণার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে ঘৃণার সৃষ্টি করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষাকে এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সুষ্ঠু প্রশাসন ব্যবস্থা ঃ দুর্নীতি রোধের জন্য সবেচেয় জরুরি হলো দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন। দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন না হলে দুর্নীতি রোধ করা যাবে না। এক্ষেত্রে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সততা ও নিষ্ঠার উপর নির্ভর করবে সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থা। তাই এক্ষেত্রে সরকারি বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের নৈতিক অবক্ষয় রোধের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সাথে সাথে সুষ্ঠু প্রশাসন গড়ে তোলার স্বার্থে অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে হবে। সকল প্রশাসনিক কার্যক্রম IT ভিত্তিতে করতে পারলে দুর্নীতি হ্রাস পাবে।
মানবিক গুণাবলীসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের মর্যাদা ও দুর্নীতিপরায়ণদের সামাজিকভাবে বয়কট করা : সমাজে যেকোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তার সততা, ও মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। এতে দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিবর্গরা সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়বে। এদেরকে সামাজিক কোনো মর্যাদাও দেয়া উচিত নয়। এরা ধনবান হলেও এদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করা উচিত। সমাজ ও রাজনীতি প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতিপরায়ণদের সংশ্রব থেকে দূরে থাকা উচিত। তবেই দুর্নীতির প্রবণতা কমবে ও দুর্নীতি হ্রাস পাবে।
স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন : দুর্নীতি দমনের জন্য সত্যিকারভাবে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করতে হবে। একে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার দিতে হবে। এ কমিশনে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তা না হলে দুর্নীতি দমন না হয়ে বরং আরো বাড়বে। বর্তমানে গঠিত কমিশনের তৎপরতা বৃদ্ধি ও কার্যকরী হওয়া উচিত। এ কমিশনের শুভ কার্যক্রমের প্রতীক্ষায় দেশবাসী। যথোপযুক্ত বেতন কাঠামো কার্যকরী করাঃ আমাদের দেশে প্রবাদ আছে, “অভাবে স্বভাব নষ্ট” সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা যদি উপার্জিত অর্থ দিয়ে ভরণ-পোষণ করতে না পারে তখন নীতি-নৈতিকতা ভুলে দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করে। এজন্য বাজারে দ্রব্যমূল্যের সাথে সংগতি রেখে মজুরি নির্ধারণ করা উচিত। অভাব অনটন না থাকলে পারে।
বর্তমান তারেক রহমানের সরকার ইতিমধ্যে সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিয়েছেন। ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন হবে। তাতে সরকারী কর্মচারী ও কর্মচারীদের দীর্ঘ দিনের দাবি পূরণ হলো। তবে এখন আমরা দেখতে চাই তারা দুর্নীতিমুক্ত, ঘুষমুক্ত, অনাচারমুক্ত দায়িত্ব পালন করবেন। মাননীয় স্পিকারের কথায় অনেক কর্মচারী ‘চোর’ এই কথার অসারতা প্রমাণের সময় এসেছে। আমরা দেখতে চাই, মানুষ স্বাভাবিকভাবে দুর্নীতি করার চেষ্টা করবে না। জীবনধারনের উপযোগী বেতন কাঠামো দুর্নীতি রোধের একটি উল্লেখযোগ্য সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
দুর্নীতি রোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা : সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মিডিয়াতে এর স্বরূপ তুলে ধরে একে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। এ উদ্যোগ সরকারি ও বেসরকারিভাবে একই সাথে নিতে হবে। প্রচার মাধ্যমগুলো এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। অতীতে দেখা গেছে এবং বর্তমানেও দেখা যাচ্ছে মিডিয়া সমাজের কোনো অন্যায় কাজকে চিহ্নিত করে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবেদন প্রচার করলে তাতে সফলতা আসে। জাতির বিবেকের মধ্যে সততা ও নিষ্ঠার প্রভাব সৃষ্টির একমাত্র উপায় মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার।
স্বাধীন বিচার বিভাগ : দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে স্বাধীন বিচার বিভাগ অপরিহার্য। যদিও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিচারকরা স্বাধীনভাবে বিচার করতে পারলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দুর্নীতি কমবে। তবে বিচার বিভাগে সৎ ও নিষ্ঠাবান বিচারক, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ করতে হবে। তা না হলে দুর্নীতি দমন করা যাবে না।
সর্বোপরি দুর্নীতি সম্পর্কে দেশের সমাজ গবেষকগণ কর্তৃক প্রণীত গবেষণাকে কাজে লাগিয়ে এবং বাস্তবায়ন করে এটি দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে আমরা এগিয়ে যেতে পারি। এজন্য প্রয়োজন একটি সিদ্ধান্তের, একটি শপথের। আর তা হচ্ছে আমি নিজে দুর্নীতি করব না, অন্যকে দুর্নীতি করার জন্য সহযোগিতা বা উৎসাহী করব না। দুর্নীতি করা অন্যায়, গর্হিত কাজ এ অনুভূতি হৃদয়ে জাগরুক রাখাই দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকার প্রধানতম উপায়।

আবুল কাসেম হায়দার
সাবেক সহ সভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ, বিজিএমইএ , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:, অষ্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
তিনি আজীবন সদস্য : এশিয়াটিক সোসাইটী বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমী, চট্টগ্রাম সমিতি, সন্দ্বীপ সমিতি ঢাকা ।
লেখক সাপ্তাহিক প্যানোরামা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।




