july-uprising

জুলাই চেতনায় গড়বো দেশ সবার আগে বাংলাদেশ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ বড় ঘটনা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ আমাদেরকে একটি স্বাধীন দেশের ভূখন্ড দিয়েছে। শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা। রক্তক্ষয়ী আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের ৭১ সাল। আর জুলাই ৩৬ আর একটি স্মরণীয়, করণীয় ও দায়িত্বপ্রাপ্ত আন্দোলনের দিন। ৫ আগস্ট ২০২৪ স্বৈরাচার হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতের দিল্লীতে তার প্রভুর নিকট আশ্রয় নিয়েছে। দেশ স্বৈরাচার মুক্ত হয়েছে। ১ হাজার ৪০০ শত শহীদের রক্তের বিনিময়ে দেশ নতুনভাবে স্বাধীনতা পেলো। পঙ্গু ও আহত ২৪ হাজারের অধিক।
৮ আগস্ট ২০২৪ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তবর্তী সরকার দেশের দায়িত্বভার নেন। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে একটি গোটা প্রজন্ম এমন নৃশংসতায় সাক্ষী হয়েছিল, যা শুধু মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে তুলনীয়। এই অভ্যুত্থান আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমুল বদলে দেয়। হাজারের উপরে মানুষ প্রাণ হারান, হাজার হাজার আহত হনÑ অনেকে দৃষ্টিশক্তি হারান বা স্থায়ীভাবে পঙ্গুত বরণ করেন। শিশুসহ অসংখ্য মানুষ নির্বিচারে গ্রেফতার হন ও বন্দী হন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারাদেশে যে স্বস্তির অনুভূতি হয়েছিল। তা শুধু একটি সরকারের পতনের প্রতিক্রিয়া ছিল না। এটি সেই আশার প্রতিফলন ছিল যে বাংলাদেশ অবশেষে এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে, যা ভয়ভীতির পরিবর্তে আইনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে, দায়মুক্তির বদলে সেখানে থাকবে জবাবদিহি, প্রতিশোধের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হবে ন্যায় বিচার। গড়বো দেশ সবার আগে বাংলাদেশ।

জুলাই আন্দোলনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার : স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের সতের বছরের অত্যাচার, অন্যায়, অবিচার, লুন্টন, খুন, গুম, আয়নাঘর, অর্থ পাচার যেমন দেশ ও জাতিকে দুর্বল করেছে, তেমনি অন্তবর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণে জাতি বেশ আশান্বিত হয়। কিন্তু শত আশা পূরণ না হলেও কিছু আশার আলো ইউনূস সরকার জাতিকে দেখিয়েছেন। আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষে তা আমাদের স্মরণে আসছে।
দেরীতে হলেও অন্তবর্তী সরকার একটি স্বচ্ছ, গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে সক্ষম হয়েছেন।

১. তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন সরকার ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ দেশ পরিচালনার ভার গ্রহণ করেছেন।
২. অন্তবর্তী সরকার ১৭টি কমিশন গঠন করেছেন। কমিশনের মাধ্যমে পরবর্তী সরকারকে করণীয় প্রদর্শন করে গিয়েছেন।
৩. জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি ধারণ করে রাখার জন্য জুলাই স্মৃতি যাদুঘর স্থাপন করে গিয়েছেন। আজ ৫ আগস্ট ২০২৬ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস তা উদ্বোধন করলেন। জাতি যুগ যুগ ধরে তা দেখে, শিখে অনুপ্রাণিত হবে।
৪. দেশের ভঙ্কুর আর্থিক খাতের রেলকে লাইনে উঠিয়ে দিয়ে চালু করার চেষ্টা করেছেন।
৫. স্বৈরাচার হাসিনাসহ সকল অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচার শুরু করেছেন। বিচারের রায়ও মৃত্যু দন্ড হাসিনাকে দেয়া হয়েছে। অন্যান্য মামলার বিচারের কাজ চলমান। আশা করি দ্রুত রায়সমূহ কার্যকরী হবে।
৬. জুলাই সনদ তৈরি করে গণভোট করিয়ে তা বাস্তবায়নের পথ দেখিয়েছেন। বর্তমান নির্বাচিত সরকার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন, ঘোষণা দিয়েছেন এবং বাস্তবায়নের দিকে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের তদন্ত :
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সময় ঘটিত মানবাধিকার লংঘনের বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য অন্তবর্তী সরকার জাতিসংঘে অনুরোধ করেন। সরকার ২০২৪ সালে ২৭ আগস্ট, ১লা জুলাই ২০২৪ থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করার আবেদন করেন।
ওএইচসিএইচ আর তদন্তের পর ২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারী তাদের ‘ফ্যাক্ট াইন্ডিং প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এইটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। স্বৈরাচার হাসিনার নির্যাতনের চিত্র এই প্রতিবেদনে পরিষ্কার বিশে^র দরবারে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে গুরুতর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাগুলো নথিভুক্ত হয়েছে এবং ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে করণীয় সুপারিশ করা হয়েছে।

তদন্তে তথ্যসমূহ :
জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে স্বৈরাচার হাসিনা সরকার স্বল্প এই সময়ের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ মানুষ হত্যা করেছেন। হাজার হাজার মানুষ পঙ্গু হয়েছে। আহত হয়েছে ২৪ হাজারেরও বেশি। গ্রেফতার হয়েছে বলা হয় ১১ হাজার ৭০০ জনকে। যদিও গ্রেফতার সংখ্যা অনেক বেশি। নিহত ও আহত সংখ্যাও তাদের প্রতিবেদনের চেয়ে অনেক বেশি।
ওএইচসিএইচআরের মতে, আওয়ামী ও তার জোট সরকার রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা সহিংসা গোষ্ঠীর সহযোগিতায় পরিকল্পিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে। ব্যাপক বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, বেআইনী শক্তি প্রয়োগ, নির্বিচারে গ্রেফতার ও আটক নির্যাতন ও অন্যান্য অমানবিক আচরণ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিন্নমত দমনের কৌশলের অংশ হিসেবে এসব নিপীড়ন উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ ব্যক্তিদের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে পরিচালনার প্রমাণ তদন্ত সংস্থা পেয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি গোয়েন্দা সংস্থা এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করেছে। জনগণের প্রতিরোধ দমনে নির্যাতনের ঘটনাগুলো গোপন করার জন্য ইন্টারনেট বন্ধ, নজরদারি, গণমাধ্যমেক ভীতি প্রদর্শন এবং চিকিৎসা সেবা বন্ধ করার মতো অমানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সব করা সম্ভব হয়েছে শেখ হাসিনার একক সিদ্ধান্তের কারণে।

তদন্ত প্রতিবেদনে তদন্ত সুপারিশমালা :
এই প্রতিবেদনে ভুক্তভোগীদের প্রকৃত প্রতিকার পাওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে। গভীর সংস্কার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশে প্রকৃত পরিবর্তন আনার জন্য পাঁচটি ভাগে সুপারিশসমূহ জেস করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষে এসে এই সকল সুপারিশ খুবই প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। জাতি এই সকল সুপারিশ ফের দেখারও বুঝার প্রয়োজন রয়েছে। জুলাই শহীদের আত্মার মুক্তির জন্য সুপারিশসমূহের বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরী।

১. জবাবদিহি ও বিচার বিভাগ :
কমিশন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, গুম কমিশনকে সহায়তা করা, সরকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত নিশ্চিত করে আইনী ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলা হয়েছে। মানবাধিকার কমিশন ২০২৫ চালু করা হয়েছিল। সুপ্রীমকোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ২০২৫ অন্তবর্তী সরকার জারি করে। এই আইন দুইটি বাতিল করা হয়েছে।

২. পুলিশ ও নিরাপত্তা বিভাগ :
পুলিশ সংস্কার কমিশনের ভিত্তিতে অন্তবর্তী সরকার একটি কমিটি গঠন করে। ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ সরকার নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ঐচ্ছিক প্রটোকলে স্বাক্ষর করে।
১৮৬১ সালের পুলিশ আইন ও মেট্রোপলিন পুলিশ অধ্যাদেশগুলো প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে।
সশস্ত্র বাহিনী ও বিজিবির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা, র‌্যাব বিলুপ্ত করা এবং বিজিবিকে শুধু সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয়ে এবং ডিজিএফআইকে সামরিক গোয়েন্দা কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।

৩. নাগরিক সুরক্ষা
নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য ওএইচসিএইচআর সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩, অফিসিয়াল সিক্রেটস আইন ১৯২৩, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯, দন্ডবিধি মানহানি সংক্রান্ত ফৌজদারী বিধান এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ বাতিল বা সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বেআইনী নজরদারি বন্ধ করার, জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (এনটিএমসি) বিলুপ্ত করার এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ (বিটিএ) সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। এই সকল বিষয় সরকার নতুন করে পদক্ষেপ নেবেন। কাজ চলমান রয়েছে।

৪. রাজনৈতিক পদক্ষেপ :
অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে সুপারিশ করা হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। কোন রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করতে বারণ করা হয়েছে। তাই আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয় নাই। তাদের বিচার হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম শুধু নিষিদ্ধ রয়েছে।
নারী ও পুরুষের সমতা নিশ্চিত করতে সকল পর্যায়ে বলা হয়েছে। তাই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দল নারীদের অংশগ্রহণ চেষ্টা করেছে।

অর্থনৈতিক সুশাসন নিশ্চিত:
অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য পাঁচ বড় বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশ থেকে দুর্নীতি, অনিয়ম, ঘুষ, চাঁদাবাজি বন্ধ করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করা, চুরি হওয়া সম্পদ অর্থ পুনরুদ্ধার করা, শ্রম অধিকার উন্নত করা, ন্যায়সঙ্গত কর ব্যবস্থা চালু করা, তরুণ ও বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
অন্তবর্তী সরকার চেষ্টা করেছেন এবং কিছু কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। বর্তমান বিএনপি সরকার এই সকল উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন।
ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক শাসনের যে আকাক্সক্ষায় জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, তাও যথার্থভাবে পূরণ করার জন্য তারেক রহমানের সরকার অক্লান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মাকে লেখা চিঠিতে শহীদ আনাস :
জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা বাহিনীর হাতে যখন একের পর এক লাশ পড়ছিল রাস্তায়, তখন আর বাসায় বসে থাকতে পারেননি গেন্ডারিয়ার আদর্শ একাডেমির দশম শ্রেণির ছাত্র আনাস। পরিবারের সদস্যদের অগোচরে মায়ের উদ্দেশে চিঠি লিখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তিনি সরকার পরতনের আন্দোলনে যোগ দেন। সেদিনই ঢাকার চানখাঁপুল এলাকায় পুলিশের গুলিতে শহীদ হন আনাস। পরবর্তী সময়ে মায়ের উদ্দেশে লেখা চিঠি প্রকাশ হলে তা সারাদেশের মানুষের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ওই চিঠিতে আনাস লেখেন- মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। আমি নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না। সরি ‘আব্বুজান। তোমার কথা অমান্য করে বের হলাম। স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। আমাদের ভাইয়েরা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে রাজপথে নেমে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অকাতরে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে।
একটি প্রতিবন্ধী কিশোর, সাত বছরের বাচ্চা, ল্যাংড়া মানুষ যদি সংগ্রামে নামতে পারে, তাহলে আমি কেন ঘরে বসে থাকব। একদিন তো মরতে হবেই। তাই মৃত্যুর ভয়ে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যু অধিক শ্রেষ্ঠ। যে অন্যের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয়, সেই প্রকৃত মানুষ। আমি যদি বেচে না ফিরি, তবে কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হয়ো। জীবনের প্রতিটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাই।
মা সানজিদা খানের কাছে ক্ষমা চেয়ে, কাঁপা হাতে ভুল বানানে চিঠিটা লিখে বাড়ি ছেড়েছিলেন শাহরিয়ার খান আনাস। শাহাদৎ নিশ্চিত জেনেও লংমার্চ টু ঢাকায় শামিল হয়ে রাজপথে নেমেছিলেন এই কিশোর। পুলিশের গুলিতে শহীদ হয়ে বরণ করে নেন বীরের মৃত্যু। আনাস পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তার রেখে যাওয়া চিঠি তাকে অমর করে রাখবে। বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।

জুলাই বিপ্লবকে ধারণ করতে হলে :
জুলাই নিরাপত্তাকে অর্থনৈতিক কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঙ্কট দেখিয়েছে যে জ¦ালানি শুধু বিদ্যুত উৎপাদনের বিজয় নয়, এটি শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই স্বল্প মেয়াদে উৎপাদনশীল খাতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ এবং সরবরাহকারীদের বকেয়া পরিশোধ জরুরী। দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ¦ালানির সম্প্রসারণ, আঞ্চলিক বিদ্যুত বাণিজ্য এবং সমন্বিত জ্বালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে প্রকৃত বিকেন্দ্রীয়করণও অপরিহার্য। অতিমাত্রায় কেন্দ্রীয়কৃত প্রশাসনিক কাঠামো স্থানীয় সমস্যা সমাধানে বিলম্ব ঘটায় এবং নাগরিক অংশগ্রহণ সীমিত করে। স্থানীয় সরকারকে আরও ক্ষমতা ও সম্পদ দিরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো ও সামাজিক সেবার মান উন্নত হবে এবং উন্নয়ন আরও জবাবদিহিমূলক হবে।
বৈষম্য হ্রাসও হতে হবে উন্নয়নকৌশলের অন্যতম কেন্দ্রীয় লক্ষ্য। জুলাই আন্দোলন আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে শুধু প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; প্রবৃদ্ধির সুফল ন্যায়সঙ্গতভাবে বন্টিত হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আঞ্চলিক বৈষম্য, মানসম্মত শিক্ষায় অসম প্রবেশাধিকার, কর্মসংস্থানে বৈষম্য, ডিজিটাল বিভাজন ও তরুণদের সীমিত সুযোগ-এসব সমস্যার সমাধান ছাড়া উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।

শেষ কথা:
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মোড় পরিবর্তনের বাঁক। জুলাইকে হৃদয়ে, জীবনে, সমাজে ও রাষ্ট্রে সকলকে ধারণ করতে হবে। জুলাই হবে আমাদের উন্নয়নের মূল সোফান, মূল চালিকা শক্তি। যখন আমরা দিক হারিয়ে যাবো, এখনি আমাদেরকে জুলাইতে ফিরে যেতে হবে। তাই জুলাই যাদুঘর আমাদের পথ চলার অনন্ত প্রেরণা।
কবি আবদুল হাই শিকদারের ‘জুলাই বাংলাদেশ’ শিরোনামে কবিতাটি খুবই প্রণিদানযোগ্য।


আমার ভাইয়ের রক্তমাখা জুলাই অনিঃশেষ
জুলাই তুমি স্বাধীন সকাল তুমিই বাংলাদেশ।

তুমি আমার কালবোশেখী টর্নেডো টাইফুন,
তুমি আমার জোছনা ও রোদ ভাতের থালায় নুন।
তুমি আমার দীপ্ত বিজয় ধান কাউনের গান,
তুমিই অসীম অন্ধকারে আলোর অভিযান।

হাজার নদী রক্ত ঢেলে দুয়ার খোলে ভোরের,
দানববংশ ধ্বংস করে বিনাশ করে চোরের।
গুমপুরীতে আনলো জুলাই দোয়েল পাখির শিস,
জুলাই তুমি আবু সাঈদ তোমাকে কুর্নিশ।

জুলাই ছিল থাকবে জুলাই আসবে জুলাই আরো,
মুগ্ধতাময় এমন জুলাই হয়নি দেখা কারো।
আনলো জুলাই মুক্ত স্বদেশ ফিরলো স্বাধীনতা,
করলো দাফন দাসত্ব আর সকল অধীনতা।
নিজের চোখে আকাশ দেখার অহংকারের দিন,
জুলাই আমার স্বপ্ন আঁকা সাত রঙে রঙিন।

আমার মায়ের বক্ষফাটা জায়নামাজের দোয়া,
জুলাই তুমি আমার বোনের অশ্রু দিয়ে ধোয়া।
আমার শিশুর রক্তে নাওয়া জুলাই অনিঃশেষ,
জুলাই তুমি থাকলে জেগে বাঁচবে বাংলাদেশ।
সংহতি আর ঐক্য দিয়ে বিভেদ করো শেষ,
জুলাই তুমি একলা আশা তুমিই বাংলাদেশ।

Abul Quasem Haider
আবুল কাসেম হায়দার

সাবেক সহ সভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ, বিজিএমইএ , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:, অষ্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তিনি আজীবন সদস্য : এশিয়াটিক সোসাইটী বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমী, চট্টগ্রাম সমিতি, সন্দ্বীপ সমিতি ঢাকা ।

লেখক সাপ্তাহিক প্যানোরামা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments