Fahim Saleh

যেভাবে উদ্যোক্তা ফাহিম

ফাহিম সালেহ জন্ম ২৩শে সেপ্টেম্বর ১৯৮৬ সাল, চলে গেলেন ১৩ই জুলাই ২০২০ সালে। খুব অল্প বয়সে দুনিয়া ছেড়ে এই ক্ষণজন্মা তরুণ দুনিয়ার চাক্য, সৃষ্টি, চমক থেকে বিদায় নিলেন। মাত্র বয়স ছিল ৩৩ বছর। জন্ম সূত্রে বাংলাদেশী। চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানার বংশ সূত্রে এই তরুণ সকলের নিকট অনুকরণীয়, অনুস্মরণীয় আদর্শ।
খুব অল্প বয়সে সফল উদ্যোক্তা ফাহিম সালেহ। বাংলাদেশে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান পাঠাওয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তিনি। নাইজেরিয়া, কলম্বিয়াতে ও বিভিন্ন উদ্যোগে বিনিয়োগ করেছিলেন। জুলাই ১৩ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে নিজের বাসায় এক নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার হন ফাহিম সালেহ। এত অল্প বয়সে যিনি নানা উদ্যোগ নিয়েছিরেন, ব্যবসা সম্পর্কে তার ভাবনা, কী ছিল? ২০১৮ সালে ২রা নভেম্বর ‘মিডিয়াম ডট কম প্রকাশিত একটি ব্লগ উদ্যোক্তাদের জন্য চারটি পরামর্শ দিয়েছিরেন ফাহিম সালেহ। পরামর্শ কয়টি আমাদের তরুণ সমাজের জন্য খুবই শিক্ষনীয়। ফাহিম সালেহ বলেন, ১৬ বছর বয়সে একজন ওয়েবসাইট ডেভেলপার হিসেবে আমার যাত্রা শুরু। তখন থেকে আমি অনেক বড় বড় উদ্যোগ নিয়েছি। যেমন এ্যাডভেঞ্চার ক্যাপিটাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়েছি, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর উদ্যোক্তাদের তহবিল দেয় এবং বেড়ে উঠতে সহায়তা করে।
এই পথ চলায় আমি অনেক কিছু শিখেছি। কিন্তু হাইস্কুলে পড়ার সময় আমার কৌশলগত চিন্তা ধারার যে ভিত গড়ে উঠেছিল, সেইটি আমাকে পরে মিলিয়ন ডলার আয় করতে সহায়তা করেছে। আপনার বয়স হতে পারে ১৬ বা ৬১, কিন্তু তাতে কিছু আসে যায় না। আমি মনে করি প্রত্যেক উদ্যোক্তার চারটি কাজ করা উচিত।

১. কম গুরুত্বের কাজ বাহিরে থেকে করিয়ে নেয়া :
ফ্রিল্যান্সাররা হতে পারেন আপনার সবচেয়ে ভাল বন্ধু। তারা আপনার সময় ও টাকা, দুটোই বাঁচানা, যা একজন উদ্যোক্তার জন্য মুল্যবান। ১৬ বছর বয়সে আমি এমন বেশ কয়েকটা সাইট চালাতাম, যেগুলো থেকে ব্যবহারকারীরা ছবি নামাতে পারতেন। এই সামান্য কাজ করতে গিয়ে আমার এত বেশি সময় চলে যেতো যে আমি নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করার, নতুন সাইট চালু বা ব্যবসা আরও বড় করার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম করতে পারছিলাম না। অতএব আমি ফ্রিল্যান্সিংয়ের ওয়েবসাইটগুলো ব্যবহার করতে শুরু করলাম। দেখলাম, এখানে ফ্রিল্যান্সারদের বিশাল একদল আছে, যারা সাশ্রয়ী মূল্যে ভার্চ্যুয়ালি আপনার চাহিদা মোতাবেক কাজ করে দিতে পারে।
এখনকার দিনে তো মানসম্পন্ন ফ্রিল্যান্সার পাওয়া আরও সহজ। বিশাল বড় ফ্রিল্যান্সারের বাজার গড়ে উঠেছে। আপনি আপনার চাহিদা মত জানাবেন। যাঁরা আগ্রহী, তাঁরাও বলবেন কত টাকার বিনিময়ে তারা কাজটা করতে পারবেন। আপওয়ার্ক এবং এই ধরনের অন্যান সাইট (মার্কেট প্লেস) ফ্রিল্যান্সারদের কাজের পর্যালোচনা করে। সেগুলো দেখে আপনি বুঝতে পারবেন যে ঐ ফ্রিল্যান্সার তাঁর কাজের কতটা দক্ষ।

এটা ঠিক, আমি যে সকল ফ্রিল্যান্সারদের কাজ দিতাম, তাদের তৈরি করতে অনেক সময় চলে যেতো। দিন শেষে এটা সব সময় সার্থক হতো। তিন দেশে বসা এক ফ্রিল্যান্সারকে ঘন্টায় ৬ থেকে ১০ ডলার দিয়ে, তাদের কাজটা বুঝাতে এক ঘন্টা সময় ব্যয় করে, আমার যে সময় বাঁচত সে সময়ে আমি আরও অনেক কাজ এগিয়ে রাখতে পারতাম।

২. মানুষের কাছে যান এবং সাহায্য চান :
কত মানুষ যে অচেনা একজনের দিকেও সাহায্যের হাত বাড়াতে আগ্রহী, জেনে বিস্মিত হবেন। ১৬ বছর বয়সে আমার মাথায় দারুণ একটা ওয়েবসাইটের ভাবনা এসেছিল। কিন্তু হোস্টিংয়ের টাকা দেয়ার মতো সামর্থ্য ছিল না। বাবার কাছে টাকা চাওয়ার ইচ্ছা আমার ছিল না। তাই আমি বিভিন্ন অনলাইন বিজনেস ফোরামে ঢুঁ মারতে শুরু করলাম। দেখিই না ভাগ্য পরীক্ষা করে, কী হয়!
অনেকে সোজাসাপ্টা বলে দিল, ‘তোমার জন্য শুভ কামনা।’ কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে আমি ছোট্ট একটি বিজ্ঞাপন বসানোর বিনিময়ে দুটি হোস্টিংয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলাম। তা বাস্তবিকভাবেই আমার প্রথম ডোমেইন ওয়েবসাইট চালু করেছিলাম বিনা মূল্যে।
আমার পরামর্শ হলো, হোক মার্কিন গায়িকা রেয়ন্স, কোনো এক বিখ্যাত খেলোয়াড় কিংবা প্রযুক্তি দুনিয়ার কোন একজন বড় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সাহায্যের জন্য কারও কাছে যেতে ভয় পাবেন না। হয়তো ইতিবাচক সাড়া দিয়ে তাঁরা আপনাকে অবাক করে দেবেন।

৩. সমমনা মানুষকে পাশে রাখুন :
সঠিক অনুেপ্ররণা ও সহায়ককর্মী খুঁজে পাওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইন ওয়েসবাইট ডেভেলপারদের যে সব সুযোগ আছে, ১৬ বছর বয়সে আমি সেইসব জায়গায় বিচরণ করতে শুরু করি। বিভিন্ন কোরামে অনেকের সঙ্গে আমার পেশাগত সম্পর্ক হলো। জানলাম কিভাবে ওয়েবসাইট বানিয়ে মাসে ১০ হাজার ডলার আয় করা যায়।
আমি একেই তরুণ ছিলাম। অনলাইনে লোকে যেহেতু আমার বয়স দেখতে পারছে না, এটা একটা সুবিধা ছিল। আমি নিশ্চিত, তাঁরা যদি জানতেন যে আমি স্রেফ একজন টিনএজার, তাঁরা আমার কথা এত গুরুত্ব দিতো না।
এখন আমি মুখোমুখি বসে ব্যবসা করতে পছন্দ করি। কখনো কোন অনুষ্ঠানে দেখা হলে বা রাতের খাবার খেতে খেতে সরাসরি কথা বললে দ্রুত বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। চোখে চোখ রাখা কিংবা অভিব্যক্তির প্রকাশ পরস্পর বিশ্বাস গড়ে তোলার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৪. ভাবমূর্তি গড়ার পেছনে বিনিয়োগ :
চোখে কিভাবে নিচ্ছে সেটাই সব বিশেষ করে যখন আপনি একটা ব্যবসা দাঁড় করাবেন। বর্তমান সময়ে সাশ্রয়ী প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে একটা দুর্দান্ত ব্ল্যান্ড বা ভাবমূর্তি গড়ে তোলার সক্ষমতা যে কারও আছে। এ কারণেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ের বড় ক্লায়েন্ট বা বিনিয়োগকারী পাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
১৬ বছর বয়সেই আমি চেয়েছিলাম আমার ব্যবসাটা যেন দেখতে নিখাদ হয়। তাই আমি ভিনদেশী পেশাদার ওয়েব ডিজাইনারদের কাজ দিয়েছিলাম, কারণ এই পদ্ধতিটি সাশ্রয়ী ছিল। আমাদের একটা ঝকঝকে মানসম্মত ওয়েবসাইট ছিল, যা বিজ্ঞাপন দাতাদের কাছে একটা ভাবমূর্তি তৈরি করেছে। এমনকি লোকে ফোন করে আমাদের সেলস ডিরেক্টরের সঙ্গে কথা বলতে চাইতো। অথচ বাস্তবতা হলো, এই বিরাট কর্মযজ্ঞের পেছনে ছিল স্রেফ দুজন, আমি আর আমার সমবয়সী ব্যবসায়িক অংশীদার ফাইল।
ব্যবসার ভাবমূর্তি গড়ে তোলার আরও হাজারো উপায় আছে। আপনি ১০ ডলার একটি ডোমেইন (ওয়েবসাইটের ঠিকানা) কিনে অল্প কিছু ডলারের বিনিময়ে সেই ডোমেইনের জন্য একটা ই-মেইল ঠিকানা ও কিনে নিতে পারেন। আর আজকাল তো স্কোয়ারের স্পেস বা ইউক্সের মতো ওয়েবসাইট হোস্টিং মাধ্যম ব্যবহার করে কোন ডেভেলপার ছাড়াই সুন্দর ওয়েবসাইট তৈরি করা যায়।
সঠিক মানসিকতা কীভাবে কী করতে হয়, সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা এবং মৌলিক বিষয়গুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার সক্ষমতা থাকলে যে কেউ যে কোন বয়সে একটা সফল ব্যবসা গড়ে তুলতে পারেন। এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা মোটেই অবাস্তব নয়।
এই অসাধারণ বক্তৃতাটি আজ আমাদের তরুণ সমাজের জন্য শুধু স্মৃতি, শিক্ষনীয়, অনুকরণীয়, চিন্তার বিষয়, গবেষনার বিষয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে এক অসাধারণ সফল উদ্যোক্তা আমাদের মাঝে ‘ঝলক’ ছড়িয়ে অল্প সময় পর দুনিয়া থেকে নির্মমভাবে চলে যেতে হলে! আর কোন তরুণকে যেন এমনিভাবে চলে যেতে না হয়, তার বিধান আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র করুক- কামনা করি।

Image Source : https://dailypost.ng/2020/07/15/founder-of-gokada-fahim-saleh-is-dead

Abul Quasem Haider
আবুল কাসেম হায়দার

সাবেক সহ সভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ, বিজিএমইএ , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:, অষ্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তিনি আজীবন সদস্য : এশিয়াটিক সোসাইটী বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমী, চট্টগ্রাম সমিতি, সন্দ্বীপ সমিতি ঢাকা ।

লেখক দৈনিক আজকের আওয়াজ ও সাপ্তাহিক প্যানোরামা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments