50 years of entrepreneurship in Bangladesh

পঞ্চাশ বছরে উদ্যোক্তা : কে কোথায়!

বাংলাদেশ ২০২১ সালে ১৬ ডিসেম্বর ৫০ বছর পূর্ণ হলো। আমাদের বিজয়জয়ন্তী। আমাদের মহান বিজয় গর্বে আমরা গর্বিত। জাতি হিসাবে আমাদের একটা বিরাট অর্জনে আমাদের জাতি গর্বিত। আমরা আনন্দিত। উন্নত সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখছি।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাস নিয়ে তেমন বড় আকারে কেউ গবেষণা করেনি। দেশের উদ্যোক্তা শ্রেণী সৃষ্টির ইতিকথা নিয়েও তেমন কোন চর্চা হয়নি। বৃটিশ, পাকিস্তান আমল থেকে এই অঞ্চলে শিল্প উদ্যোক্তা সৃষ্টির একটি বিশেষ ধারা কাজ করে। রুশ অর্থনীতিবিদ এসএস বারানভ ষাটের দশকে তখনকার পূর্ব পাকিস্তান এলাকার উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। সেখানে তিনি ১৯৬৯-৭০ সালের বাঙ্গালী ব্যবসায়ী পরিবার হিসাবে ১৬ পরিবারের নাম উল্লেখ করেছিলেন। আশির দশকে “বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ ও অভ্যন্তরীণ অসংগতি” শিরোনামে একটি প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন “বাংলাদেশের পুঁজিবাদ, ১৯৬০ এর দশকে যার উদ্ভব, কোনো ক্রমেই ব্যক্তি পুঁজির স্বাভাবিক বিকাশের ফসল নয়।”

কিভাবে উদ্যোক্তা শ্রেণীর বিকাশ :
নানাভাবে আমাদের দেশে উদ্যোক্তা শ্রেণীর জন্ম। দরিদ্র থেকে ব্যবসা শুরু করে বড় শিল্পপতি হয়েছেন। শূন্য থেকে ধনী শ্রেণীর জন্ম আমাদের দেশে। অবাক করার মতো ঘটনাও রয়েছে, আমাদের ধনী শ্রেণীর জন্ম নিয়ে।

আশির দশকে রেহমান সোবহান লিখেছিলেন, “বাঙালী বুর্জোয়া শ্রেণিটি একটি সজীব বিকাশের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠেনি- যেমনটি গড়ে ওঠে খুদে ব্যবসায়ী থেকে বৃহৎ ব্যবসায়ী এবং বৃহৎ ব্যবসায়ী থেকে শিল্পপতি।”
তবে ৫০ বছরে এসে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, কঠোর পরিশ্রম করে, ছোট থেকে বড় শিল্পপতি হয়েছেন, এমন বেশ কিছু উদাহরণ আছে। এদের বড় অংশই এক সময় খুব ছোট ব্যবসায়ী ছিলেন, ব্যবসা থেকে আস্তে আস্তে পুঁজি বাড়িয়ে কঠোর পরিশ্রম করে উৎপাদন খাতে এসেছেন।

১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান আমলে বাঙালি ব্যবসায়ী ছিল না বললে চলে। ইতিহাসে দেখা যায় প্রথম বাঙালি ব্যবসায়ী তিনি ছিলেন একজন সরকারী কর্মকর্তা। একে খান গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাসেম খান চট্টগ্রামের এক সওদাগর পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন। পরে শ্বশুরের অর্থে ব্যবসা করে বড় শিল্পগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠা করেন। আর ইসলাম গ্রুপের জহুরুল ইসলাম সামান্য একটি কেরানী চাকরি করতেন। চাকরি ছেড়ে ঠিকাদারী ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে কঠোর পরিশ্রম ও সাধনা বলে তিনি বড় ব্যবসায়ী হিসাবে দেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। রিয়েঠ এস্টেট ব্যবসার প্রতীক হিসাবে তিনি বাংলাদেশে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। সর্বশেষ বাজিতপুরে মেডিকেল কলেজ স্থাপন করে জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করে গিয়েছেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পূর্বে আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আকিজউদ্দিন কলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে জীবনের প্রথম সময় কমলালেবু বিক্রি করে জীবন কাটাতেন। ধীরে ধীরে হকারী করে মূলধন সংগ্রহ করেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর মূলধন সংগ্রহ করে শিল্প ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। তাই আজকের আকিজ গ্রুপ, বৃহৎ শিল্প গ্রুপ। নিজের একান্ত চেষ্টা, পরিশ্রম তাকে জীবনের সফলতা এনে দিয়েছে।
আমাদের দেশের আর এক শিল্প গ্রুপ মেঘনা গ্রুপের উত্থান অতি ক্ষুদ্র থেকে। মোস্তফা কামাল ব্যবসা শুরু করেন রাস্তার পাশে টং দোকান থেকে। ধীরে ধীরে কঠোর পরিশ্রম, চেষ্টায় আজ মেঘনা গ্রুপ।
চট্টগ্রাম জেলার আর এক শিল্প উদ্যোক্তা আবুল খায়ের গ্রুপ। তিনি জীবনের প্রথম ব্যবসা শুরু করেন মুদি দোকান দিয়ে। আজ দেশের বৃহৎতম শিল্প গ্রুপ। কোন সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই নিজের চেষ্টায় আবুল খায়ের শিল্প গ্রুপ।

‘মালা শাড়ী’ আমাদের সকলের নিকট খুবই পরিচিত। আনোয়ার হোসেন লেখাপড়া বেশি করতে পারেন নাই। মাত্র ১২ বছর বয়সে সংসার চালাতে গিয়ে ১৫ টাকা বেতনে দোকানে চাকরি করতেন। এই ১৫ টাকা বেতন দোকানে চাকরি করা মানুষটি দেশের বড় শিল্প গ্রুপের মালিক হয়েছিলেন। ব্যাংক, বীমা, শিল্প সকল খাতে তার সফল বিনিয়োগ।
বর্তমান আমাদের সকলের সামনে বেড়ে উঠা ওয়ালটন গ্রুপ। একটি জেলা শহরে ঢেউ টিনের দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু। এসএম নজরুল ইসলাম ‘ইলেকট্রনিক্স জায়ান্ট’ ওয়ালটন এর প্রতিষ্ঠাতা। আজ দেশের বৃহৎ শিল্প গ্রুপের মালিক। দিন দিন সমৃদ্ধি তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মেধা, চেষ্টা, পরিশ্রম ‘ওয়ালটন গ্রুপ’ সকলের দৃষ্টিতে আকর্ষণীয়।
বাংলাদেশের আর একটি সফল শিল্প গোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপ। স্যামসন এইচ চৌধুরী এই গ্রুপের মূল প্রতিষ্ঠাতা, জীবনের শুরুতে ঔষধের দোকান দিয়ে ব্যবসা শুরু। তাও চারজন বন্ধু মিলে শুরু করেন। সফলতার শেষ পর্যায়ে স্যামসন এইচ চৌধুরীও তার পরিবারকে আমরা দেখতে পাচ্ছি/বাকী তিন বন্ধু খোঁজ পাই নাই। তবে তিনি সপল শিল্প উদ্যোক্তা।

ব্যাংক ঋণ নির্ভর শিল্প উদ্যোক্তা :
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশে কিছু সংখ্যক শিল্প ব্যবসায়ী ব্যাংকের ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হন। শিল্প ও স্থাপন করেন। সফলতাও দেখিয়েছেন। বিশেষ করে ইস্টার্ন গ্রুপের জহুরুল ইসলাম ব্যাংক থেকে প্রচুর ঋণ নিয়ে শিল্প গড়ে তোলেন।
দুই ভাই মিলে পারিবারিক ব্যবসা তাদের। তার মৃত্যুর পর দুই ভাই আলাদা ব্যবসা করছেন।
অন্যদিকে প্রাণ আরএফএল গ্রুপ দেশের আর একটি সফল শিল্প গ্রুপ। প্রচুর ব্যাংকের ঋণ নিয়ে এখনও ব্যবসা করছেন। তবে এখনও ঋণ খেলাপী হন নাই। সফলতার সূর্য আজও তাদেরকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে।
ইউনাইটেড গ্রুপ অবশ্য ব্যাংক ঋণ নির্ভর শিল্প গোষ্ঠী নয়। ব্যাংক ঋণ না নিয়ে নগদ অর্থে ভাল ব্যবসা করছেন। তবে সব সময় সরকারী দলের সহযোগিতা পেয়ে আসছেন। সরকারের সু আনুকূল্যে তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি খাতে ইউনাইটেড গ্রুপের ব্যবসা বেশ জমজমাট।
দেশের অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী বেক্সিমকো গ্রুপ। দাপটের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক নির্ভর ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন। সরকারী সহযোগিতা ও আনুকূল্য নিয়ে তাদের ব্যবসার প্রসার। তবে নিজের সম্পদের চেয়ে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ অনেক সময় অনেক বেশী বলে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। বর্তমানে সরকারের বেসরকারী শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা। সংসদ সদস্যও বটে।

তৈরি পোশাক নির্ভর উদ্যোক্তা :
বাংলাদেশের সত্যিকার শিল্প বিপ্লব ঘটে তৈরি পোশাক শিল্প খাত দিয়ে। ১৯৭৫ সালের পর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থান। যদিও ১৯৭৮ সালে ২৮ জুলাই ফ্রান্সে প্রথম ১০ হাজার শাট রপ্তানি করে রিয়াজ গার্মেন্টস। সেই তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রথম তৈরি পোশাক শিল্পের প্রথম উদ্যোক্তা রিয়াজউদ্দিন।
কিন্তু রিয়াজউদ্দিন তৈরি পোশাকের প্রথম রপ্তানিকারক হলেও জীবনের শেষ দিকে এসে সফলতা তেমন দেখাতে পারেন নাই। তার মৃত্যুর পর পরবর্তী প্রজন্ম তার ব্যবসাকে উজ্জ্বল করতে পারেন নাই।
বরং একই সময় দেশে প্রথম শতভাগ রপ্তানিমুখি পোশাক শিল্প স্থাপন করে পথ দেখিয়েছিলেন সাবেক সচিব নুরুল কাদের। ১৯৭৫ সালের পর নুরুল কাদের তখনকার বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নুরুল ইসলাম মিলে যে দুইটি বিশাল উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তা ভবিষ্যতে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের পথকে সহজ করে দেয়। এই দুইটি নীতি হচ্ছে বিলম্বে দায় পরিশোধের ব্যাংক টু ব্যাক এলসি খোলা এবং বিনা শুল্কে কাঁচামাল আমদানি করার বন্ডেড ওয়্যার হাউস সুবিধা। এই দুই সুবিধার কারণে বড় অংকের পুঁজি ছাড়াই তৈরি হয়েছিল হাজার হাজার পোশাক কারখানা, গড়ে উঠেছিল বিপুল সংখ্যক শিল্প উদ্যোক্তা। ঢাকা, চট্টগ্রাম শহরের অলি-গলিতে তৈরি পোশাক শিল্পের স্থাপন ছিল বাংলাদেশের শিল্প বিপ্লবের শুরু।
যাদের হাত ধরে তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থান, সবাই যে সফল তা বলা যায় না। অনেকে ব্যবসা থেকে সরে পড়েছেন। অনেকে অন্যখাতে বিনিয়োগে জড়িয়েছে। ফেনীর মোশাররফ হোসেন তৈরি পোশাক নিয়ে শুরু হলেও পরে জনশক্তি রফতানিতে চলে যান। পরবর্তী সময় রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে সংসদ সদস্য হন। তিনি বিজিএমই সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
এক সময় পোশাক শিল্পের নাম ছিল ফজলুল আজিম। উভয় পরবর্তী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। পোশাক খাতে ও নাম আর রইল না। তাই কাজ শেষে সফল উদ্যোক্তার নামে রাখাও কঠিন।
সেনা কর্মকর্তা থেকে অবসর পর তৈরি পোশাক শিল্পে আসেন ক্যাপ্টেন সিনা। সিনা গ্রুপ। বেশ বড় শিল্প গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। কাঁচপুরে তার শিল্প নগরী । কিন্তু বর্তমান ২০২০ সালে এসে অনেকটা হারিয়ে যাচ্ছেন। এক সময় তিনিও বিজিএমই সভাপতি ছিলেন।
অতি ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে বড় উত্থান ঘটে ইয়ুথ গ্রুপের ১৯৮৪ সাল থেকে। ফিরোজ আলম ও আবুল কাসেম হায়দার এই গ্রুপের এমডি ও চেয়ারম্যান ছিলেন। পরবর্তীতে এই গ্রুপের একটি অংশ জ্বালানী খাতে বিনিয়োগ করে সফলতা অর্জন করে। টেক্সটাইল, জ্বালানী খাতে ইয়ুথ গ্রুপের বড় বিনিয়োগ। আবুল কাসেম হায়দার এক সময় এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ, বিটিএমএ সহ সভাপতির দায়িত্বপালন করে। সফল উদ্যোক্তা ও পথ চলার আদর্শ। তিনি শিল্পের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা, লিজিং ও সমাজ সেবায় ও অবদান রাখেন।
মোহাম্মদী গ্রুপ নামে আনিসুল হক তৈরি পোশাক শিল্পের সফল উদ্যোক্তা হয়ে পরবর্তীতে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ঢাকা শহরের মেয়র দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ও বিজিএমই সভাপতি ও এফবিসিসি সভাপতি ছিলেন।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের প্যাসিফিক গ্রুপ তৈরি পোশাকের বড় উদ্যোক্তা। মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন একজন সফল তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তা।
এনভয় গ্রুপের কুতুবউদ্দিন ও আবদুস সালাম মুর্শেদী তৈরি পোশাকের পর টেক্সটাইল শিল্পে ভাল বিনিয়োগ করেন। আবদুল সালাম মুর্শেদী ফুটবল ফেডারেশন থেকে অবশেষে সংসদ সদস্য ও শিল্পপতি হিসাবে বেশ সফল।
তৈরি পোশাক শিল্প থেকে বস্ত্র খাতের অন্যান্য শাখায় ভাল বিনিয়োগ করে সফল শিল্প উদ্যোক্তা বাদশাহ মিয়া, ফকির গ্রুপের ফকির, ইউসুফ আলী, হা-মীম গ্রুপের এ কে আজাদসহ অনেকে।
মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম চট্টগ্রাম থেকে খালি হাতে ঢাকায় আসেন। কথিত আছে মাত্র ৬৭ টাকা নিয়ে তিনি ইসলামপুর দোকানে বিক্রয় কর্মী হিসাবে চাকরি নেন। সেই নুরুল ইসলাম কিভাবে পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠা করে নোমান গ্রুপ। বর্তমানে দেশের বস্ত্রখাতের বড় বিনিয়োগকারী নারী, সফল উদ্যোক্তা। দোকানদারী থেকে শুরু যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠা নুরুল ইসলাম বাবুলের ব্যবসা। প্রথম জীবনে ফুটপাতে হকারী করেন। কিভাবে, কখন, ধীরে ধীরে বড় শিল্পপতিতে আত্মপ্রকাশ করলেন। অবাক হওয়ার মত। বস্ত্রখাতের বড় ব্যবসায়ী। রিয়েল এস্টেট ও ভূমি ব্যবসায় কিছুটা সাফল্য রয়েছে। ইলেকট্রনিক ও সংবাদপত্র ব্যবসায় সফল বাবুল। ২০২১ সালে করোনা আক্রান্ত হয়ে চলে যান পৃথিবী থেকে। দ্বিতীয় প্রজন্ম ব্যবসা দেখছে। স্ত্রী ব্যবসা ও রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ভবিষ্যতে কি ঘটবে তা দেখার অপেক্ষায়।
নোয়াখালী জেলার বাসিন্দা পার্টটেক্স গ্রুপের কর্ণধার আবুল হাশেম। পরবর্তীতে রাজনীতিতে জড়িত হয়েছিলেন। ক্ষুদ্র থেকে অনেক ব্যবসার জন্ম দিয়েছিলেন। ক্ষুদ্র থেকে অনেক ব্যবসার জন্ম দিয়েছিলেন। সফল বলা কঠিন, তবে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। বর্তমান দ্বিতীয় প্রজন্ম পার্টেক্স গ্রুপ পরিচালনা করছে। সফলতা কিছুটা। তবে তেমন ভাল যাচ্ছে না। দেখার অপেক্ষায় আমরা দ্বিতীয় প্রজন্মকে দেখবো। হাশেম জীবনের শেষ দিকে এসে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সংসদ সদস্যও হয়েছিলেন। পরে রাজনীতি ছেড়ে দেন।

আবার পোশাক খাত দিয়ে ব্যবসা শুরু করে ডিবিএল। দুলাল ব্রার্দাস লিমিটেড নামে। চার ভাই শুরু থেকে একত্রে ব্যবসা করছেন। বর্তমানে টাইলস, তথ্যপ্রযুক্তিসহ অন্যান্য খাতে সফল বিনিয়োগকারী সফল উদ্যোক্তা। আরও অনেক সফল উদ্যোক্তা তৈরি পোশাকের খাতে রয়েছে। প্রবন্ধের কলেবর বড় হবে বিধায় সংক্ষেপ করতে হলো। ভবিষ্যতে আবারও লেখার চেষ্টা করবো।

তৈরি পোশাকের বাহিরের খাত :
এমএস বারানভ যে ১৬ পরিবারের তালিকা শিল্প উদ্যোক্তা হিসাবে উল্লেখ করেছিলেন বিগত ৫০ বছরে তাদের অনেকে হারিয়ে গিয়েছেন। বিশেষ করে যারা পাট শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদের অনেকে আর ব্যবসার সঙ্গে নাই। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাট শিল্প জাতীয়করণ করা হয়। তাই অনেকে এ শিল্প হারিয়ে পেলেন। অনেকে এই ব্যবসা ছেড়ে দেন।
আমাদের দেশে সুপ্রতিষ্ঠিত ট্রান্সকম গ্রুপ। এই গ্রুপের অন্যতম উদ্যোক্তা লতিফুর রহমান ছিলেন খান বাহাদুর মুজিবর রহমানের পুত্র। তিনি পাট ব্যবসা ছেড়ে অন্য ব্যবসায় আসেন। বিদ্যুৎ, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, খাদ্য ও অন্যান্য খাতে সফল শিল্পখাত। দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলী স্টার তারই প্রতিষ্ঠা। সফল শিল্প উদ্যোক্তা ট্রান্সকম গ্রুপের প্রতিষ্ঠা লতিফুর রহমান।

অন্যান্য খাতে উদ্যোক্তা তৈরি :
তৈরি পোশাক শিল্প ছাড়াও বাংলাদেশে বহু নতুন নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণীর সৃষ্টি হয়েছে। দেশকে এই সকল উদ্যোক্তা নানাভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এক সময় ভাগ্যের গুণে একচেটিয়া ব্যবসা ছিল চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের। এখন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ভোগ্য পণ্য ব্যবসায় একচেটিয়া আধিপত্য নাই। চট্টগ্রামের সূফি মিজানুর রহমান এক সময় শুধু ভোগ্য পণ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। তার দুই ভাই তৈয়ব ও মোহাম্মদ আবুল কালাম ও ভোগ্য পণ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। এই দুই ভাই টিকে গ্রুপ নামে বড় ব্যবসায়ী। এখন এই তিন জনই ভোগ্যপণ্য ছাড়া নানা শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। দেশের বড় ব্যবসায়ী এখন। তবে ভোগ্য পণ্য ব্যবসায় তখন বড় অংশ দখল করেছেন সিটি গ্রুপের ফজলুর রহমান ও মেঘনা গ্রুপের মোস্তফা কামাল। এছাড়াও আরও বহু ভোগ্য পণ্য ব্যবসায়ী দেশ নতুন করে এসেছেন।
বাংলাদেশে এখন তৈরি পোশাক শিল্প, বস্ত্র শিল্প, পাট ও ভোগ্যপণ্য ব্যতিত কৃষি ও খাদ্য পণ্যে প্রচুর বিনিয়োগ এসেছে। এই সকল খাতে সরকারের বড় চাকরি ছেড়ে বড় উদ্যোক্তা হয়েছে এসিআই গ্রুপের আনিস উদ দৌলা এবং কাজী ফার্মের কাজী জায়েদুল হাসান। তার গ্রুপের নাম কাজী গ্রুপ বা কাজি ফার্ম।
এক সময় কাজী জাহিদুর হাসান প্রথমে তৈরি পোশাক নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। পরবর্তীতে এই খাত ছাড়া তিনি কৃষি ও খাদ্য পণ্য ব্যবসায়ে মনোযোগ দেন। বেশ সফলও হয়েছেন। তিনি শিক্ষা ও টিভি খাতেও বিনিয়োগ করেন। দেশের একজন সফল, সৎ ও নিষ্ঠাবান শিল্প উদ্যোক্তা কাজী জাহিদুল হাসান।
কুষ্টিয়ার বিআরবি গ্রুপের মজিবর রহমান একজন সৎ, সফল শিল্প উদ্যোক্তা। শিল্প নিয়ে তার যাত্রা শুরু। কুষ্টিয়া বিসিক অঞ্চলে তার শিল্প। এখন তিনি দেশের বড় শিল্পপতি। স্বাস্থ্য খাতেও তিনি বিনিয়োগ করেছেন। ক্ষুদ্র থেকে আজ বৃহৎ শিল্প গ্রুপ।
চামড়াজাত শিল্পে উদ্যোক্তা সৈয়দ মনজুর এলাহী। চামড়া ও চামড়া জাত পণ্য তৈরিতে তিনি সফল। বিদেশে রপ্তানিও করছেন। দেশে বিদেশে তার পণ্যের সুনাম রয়েছে। তিনি একজন সৎ, যোগ্য সফল শিল্প উদ্যোক্তা।
আবদুল আউয়াল মিন্টু ও একজন সফল ব্যবসায়ী। তিনি এফবিসিআই সভাপতির দায়িত্ব দুই দুই বার পালন করেন। স্পিনিং মিল থেকে এখন একজন সফল কৃষি পণ্য উদ্যোক্তা। বীজ ও শাক সবজি তৈরিতে দেশে তার অবদান রয়েছে। কৃষি বীজ তৈরি ও বিক্রি তিনি সফলতা দেখিয়েছেন। তবে তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পূর্বে আওয়ামী লীগ করলেও বর্তমানে বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে বেশ সক্রিয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে পূর্ব বাংলায় ব্যবসা বাণিজ্য মূলত অবাঙালীদের হাতে ছিল। যে কয়টি বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান ছিল, তাও অবাঙালীদেও বা পাকিস্তানীদের। ১৯৭১ সালের পর সকলে পশ্চিম পাকিস্তান চলে যান।
বাংলাদেশ সরকার প্রায় সকল বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণ করেন। তাই অবাঙালীদের চলে যাওয়ার পর দেশে শিল্প বাণিজ্য বড় রকমের ফাঁক সৃষ্টি হয়। তবে দুইটি পরিবার দেশ স্বাধীণ হওয়ার পরও বাংলাদেশে থেকে যাননি। একটি ইস্পাহানি গ্রুপ, অন্যটি আকবর আলী আফ্রিকাওয়ালা পরিবার। চা, ইস্পাত শিল্পসহ নানা ব্যবসায় এই গ্রুপ দুইটি এখনও বাংলাদেশে বড় শিল্প উদ্যোক্তা, সফলতার সঙ্গে এই গ্রুপ দুইটি বাংলাদেশে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

সরকারের সহযোগিতায় :
সব সময় সরকারের সরাসরি সহযোগিতায় ব্যবসা বাণিজ্য আমাদের দেশে হয়ে আসছে। নিরেট ব্যবসায়ী শক্তিতে ব্যবসা করা কঠিন হয়। বাংলাদেশে বিদ্যুত খাতে উত্থান বলতে গেলে সরকারী সহযোগিতায়। এইখানে সামিট গ্রুপ অগ্রে রয়েছে। সামিট গ্রুপের মুহাম্মদ আজিজ খান বেসরকারী বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ প্রদর্শক। সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ প্রকল্প সামিট গ্রুপের। ইউনাইটেড গ্রুপের হাসান মাহমুদ রাজাও বিদ্যুত খাতে ভাল বিনিয়োগ করেছেন। সফলতা উভয়ের রয়েছে।তাছাড়া স্বাস্থ্যখাত ও শিল্প খাতে বিনিয়োগ রয়েছে। ২০০৯ সালে সরকার ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে সুযোগ দেন। তখন অনেকে উদ্যোগ নেয়। আমি ও আমার কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ফিরোজ আলম শাহাজী বাজার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেই। ইয়ুথ স্পিনিং মিলস লিমিটেডের মাধ্যমে প্রথমে শাহাজী বাজার বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দরপত্রে আমরা নির্বাচিত হই। তাই এই খাতের প্রথম উদ্যোক্তা চেয়ারম্যান হিসাবে আমার স্বীকৃতি রয়েছে। পরবর্তীতে ফিরোজ আলম অন্য উদ্যোক্তা নিয়ে শাহাজীবাজার বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে চলে যায়। নানা কারণে এই কোম্পানির সঙ্গে আমার বিনিয়োগ রইল না। তবে কোম্পানি চলেছে। ব্যবসা বড় হয়েছে। আরও দুই বিদ্যুৎ কোম্পানির অংশীদার ও শাহাজীবাজার বিদ্যুৎ কেন্দ্র হয়েছে। সফলতা এসেছে।
অনেকে বিদ্যুৎ ব্যবসায় ভাল করতে পারেন নাই। ব্যাংক নির্ভর এই খাত সকলকে স্বার্থক করতে দেয়নি। যেমন অটবি ও রহিম আফরোজ গ্রুপ বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ করে সফল হতে পারে নাই।

অন্যান্য ব্যবসা :
বাংলাদেশ হওয়ার পর ভূমি নিয়ে ব্যবসা বেশ জমে উঠেছে। অনেকে সফল হয়েছেন। তবে অনেকে বিতর্কিতও হয়েছেন। অনেক টিকে আছেন, অনেকে এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। হাউজিং রিয়ৌ স্টেট যাতে ব্যবসা এক সময় তৈরি পোশাক শিল্পের পরই স্থাপন দখল করে। কয়েক হাজার ভূমি ব্যবসায়ী ও এ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাদের সমিতিও বিজিএমইএ মতো শক্তিশালী। যেমন শক্তিশালী জনশক্তি রপ্তানিকারক সমিতি।
দেশে প্রথমে এই খাতে অগ্রদূত বলা যায় জহুরুল ইসলামের ইস্টার্ন হাউজিং। বহু ভাল ভাল প্রকল্প ইস্টান হাউজিং বাস্তবায়িত করেছে। আবাসন সমস্যার ভাল সমাধান দিয়েছে। একই সাথে সাথে বসুন্ধরা গ্রুপের নাম উল্লেখ করতে হয়। ঢাকায় রাজধানীর বিরাট অংশ দখল করে আছে বসুন্ধরা আবাসিক প্রকল্প। আকবর সোবহান এই গ্রুপের প্রধান উদ্যোক্তা। এই খাতে তিনি সফল। আরও কিছু কিছু ভূমি ব্যবসায়ী এই খাতে বিনিয়োগ করেছে। আমিন মোহাম্মদ গ্রুপ আর ও একটি ভূমি ব্যবসায়ী এবং এ্যাপার্টমেন্ট ব্যবসায়ী। তারাও অনেক ক্ষেত্রে সফল। তবে অনেকের এই ক্ষেত্রে ভাল দুর্নাম রয়েছে। সঠিক সময়, সঠিকভাবে মালিকানা বুঝে দেয়ার ক্ষেত্রে বেশ অসুবিধা অনেকে করছেন, করেছেন। জমি ক্রয় ক্ষেত্রেও দুর্নাম কিছুটা রয়েছে। অনেকের ভূমি কমমূল্যে, কখনো কখনো জোর করে দখল করে বাণিজ্য করার খবর রয়েছে। সরকারের আইন-কানুনকে সব সময় সব কোম্পানি সমানভাবে মেনে চলতে পারছে না। তাই এই খাতে সুখ্যাতি অনেকে অর্জন করতে পারেনি। তবে বেশ কিছু ভাল ভাল রিয়েল স্টেট কোম্পানি গুণগতমান বজায় রেখে দেশে কাজ করছে।
এই খাতে বেশ ভাল উদ্যোক্তা শ্রেণীর তৈরি হয়েছে। সামনে আরও তৈরি হবে। এই ক্ষেত্রে কেউ কেউ সরকারি সহায়তা ও পেশীশক্তি ভর করে ভূমি ব্যবসা থেকে বিপুল সম্পদশালী হয়েছেন। নৈতিকতা ও নীতি আদর্শ অনেক সময় কেউ কেউ জানার চেষ্টাই করেননি। তবে কিছু সংখ্যক সফল, সৎ উদ্যোক্তা সব খাতেই রয়েছে।

সবশেষে :
আমাদের ৫০ বছরের বহু উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। সরকারের নীতি সহায়তার কারণে বৃহৎ উদ্যোক্তা শ্রেণী তৈরি সম্ভব হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ অনেক। সরকারের অভিযোগ রয়েছে। সব চেয়ে বড় অভিযোগ দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য। ঘুষ ছাড়া দেশে যেন কোন কাজই হয় না। দুর্নীতিকে ব্যবসায়ীগণ ব্যবসার একটি স্বাভাবিক খরচ হিসেবে ধরে নিয়েছে। সরকার ও বলছেন ব্যবসায়ীগণ টেক্স, ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছেন। সব কিছুর মূলে দুর্নীতি, ঘুষ, অনিয়ম ইত্যাদি।
বিগত ৫০ বছরে দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তাগণ দায়িত্ব নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানে তৃতীয় প্রজন্ম এগিয়ে এসেছে। নতুন প্রজন্মের সকলে কিন্তু ব্যবসাকে এগিয়ে নিতে পারছেন না। অনেকের সামর্থ্য ও যোগ্যতার কমতি রয়েছে। বাংলাদেশের উদ্যোক্তা শ্রেণীর নিকট এইটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করে আমাদের শিল্প ও বাণিজ্যকে এগিয়ে নিতে হবে। ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন এই নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের দ্বারাই সম্ভব হবে।

Abul Quasem Haider
আবুল কাসেম হায়দার

সাবেক সহ সভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ, বিজিএমইএ , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:, অষ্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তিনি আজীবন সদস্য : এশিয়াটিক সোসাইটী বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমী, চট্টগ্রাম সমিতি, সন্দ্বীপ সমিতি ঢাকা ।

লেখক দৈনিক আজকের আওয়াজ ও সাপ্তাহিক প্যানোরামা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

4.3 3 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments