কবি ফররুখ আহমদ : আমাদের অনুপ্রেরণা বাতিঘর

“যেখানে উত্তাল স্রোতে দিশাহারা মত্ত এ নাবিক
সমুদ্রের ঘন বনে নাহি খুঁজে পায় তার দিক
শুধু দেখে বহু দূরে জোনাকির উজ্জ্বল প্রদীপ
জ্বলিয়া মাটির মেয়ে মরীচিকা তালে পরে টীপ,
যার লাগি প্রতি রগে জেগে উঠে টান
মৃত্তিকা সে নাবিকের প্রাণ।”

কবি ফররুখ আহমদ কথাগুলো তাঁর গ্রন্থ “হে বন্য স্বপ্নেরা” সমগ্র শিরোনামে লিখেছেন। বইটি প্রকাশিত হয় নভেম্বর ১৯৭৬ সালে। ফররুখ আহমদ কেন্দ্রীয় স্মৃতি সংসদ কর্তৃক প্রকাশিত। প্রকাশক ছিলেন বিখ্যাত সচিব, সাহিত্যিক মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।


কবি ফররুখ আহমদকে আমরা জানি একজন মুসলিম রেনেসার কবি হিসাবে। ১৯৭৪ সালে যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র, তখন একবার কবিকে দেখার জন্য তার সরকারি বাসভবন ইস্কাটনে গিয়েছিলাম। বাসায় গিয়ে কবিকে নিজ চোখে দেখে এসেছিলাম। তখন তেমন বেশী কিছু কবি সম্পর্কে আমি জানতাম না। বন্ধুদের মুখে কবির সুবর্ণনা শোনে কবিকে দেখার ইচ্ছা হয়। তখন সবে মাত্র এইচএসসি পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হয়েছি। অবশ্য স্কুল জীবনে আমার কবিতা লেখার বেশ ঝোক ছিল। কবিতা ও লিখে ছিলাম। চট্টগ্রামের আজাদী পত্রিকায় আমার বেশ কয়েকটি কবিতা ছাপা হয়। তবে প্রবন্ধ লিখে আমি স্কুল জীবনে বেশ পুরস্কৃত হয়েছি। একবার যখন আমি দশম শ্রেণীর ছাত্র তখন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার পক্ষ থেকে “স›দ্বীপ উন্নয়ন সমস্যা ও সম্ভাবনা” শীর্ষক রচনা প্রতিযোগীতায় একমাত্র প্রথম পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলাম। ১৯৬৯ সালের কথা। নগদ পুরষ্কার পেয়েছিলাম। আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব আবুল খায়ের স্যার এই আনন্দে স্কুল ছুটি ঘোষণা করেন। সে কি আনন্দ। স্কুল জুড়ে আমার প্রশংসা। যাক সেই কথা। আজ আমাদের প্রিয় কবি ফররুখকে নিয়ে ভাবনা।

কবি ফররুখ আহমদ এর জীবনের কর্মময় সময়কে আমরা দুটো ভাগে ভাগ করতে পারি। কবির সৃষ্টি কাব্য সাত সাগরের মাঝ, সিরাজাম মুনীরা, নৌফেল ও হাতেম প্রভৃতি কয়েকটি কাব্য প্রকাশের পূর্বেকার কর্মময় জীবন। আর দ্বিতীয় অধ্যায় হচ্ছে উল্লিখিত কাব্যগ্রন্থ রচনা থেকে পরবর্তী তার সাহিত্য চর্চা জীবন।


কবি ফররুখ আহমদ ১০ই জুন ১৯১৮ সালে মাগুরা জেলার শ্রীপুর উপজেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। তার মৃত্যু হয়েছিল ১৯শে অক্টোবর ১৯৭৪ সাল। বাংলা সাহিত্যের রোমান্টিক কবি ফররুখ আহমদ। যদিও তাকে অনেকে মুসলিম রেনেসাঁর কবি হিসাবে বলে থাকেন।
কবি ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। ভাষার উপর তার কবিতা আজও পাঠকে মোহিত করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কবির অকুন্ঠ সমর্থন জাতিকে উদীপ্ত করে।


বাংলা ভাষার উপর কবিতায় কবি বলেন, কবি ফররুখ আহমদ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিশিষ্ট সাহিত্যিক লেখক গবেষক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী কবির লেখা “হে বন্য স্বপ্নেরা” কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় বলেন, “যে সব কারণে কোন কবির প্রাথমিক রচনা সঞ্চায়নযোগ্য বলে গণ্য হয় তার সবগুলিই এই কাব্যে বর্তমান। প্রথমত: সেই কবিকে অবশ্যই একজন অসামান্য কবি হতে হবে। দ্বিতীয়ত: সেই কবিতাগুলির একটা স্বকীয় মূল্য থাকতে হবে। এবং তৃতীয়ত: ঐ কবির পরিণত রচনার সাথে এসব কবিতার একটা যোগসূত্র থাকতে হবে।ফররুখ আহমদ যে একজন অসামান্য কবি এ বিষয়ে অনেকের মতো আমিও নি:সন্দেহ।”


কবি জীবনের প্রথম দিকের কবিতা, ছড়ায়, প্রবন্ধে যে ভাব, চিন্তার বিকাশ ঘটেছিল পরবর্তীতে তা স্থায়ী লক্ষণ হিসাবে দেখা যায়। তার কবিতায় শব্দ প্রয়োগ, উচ্চারণের দিকে প্রবণতা এবং কল্পনার দূরাচারিতা। এই পর্বে তিনি সনেটের আঙ্গিকে আত্মস্থ হয়েছেন। ‘শিকার’, ‘জেয়ার’, ‘নাবিক’ ‘পাথরের দিন’ ও ‘ঘুম’ এর মতো দৃঢ়বন্ধ সনেট লিখেছেন ভাষায় সঞ্চার করে দিয়েছেন এক স্বাস্থ্যোজ্জ্বল কান্তি-‘শিকার’ শিরোনামে কবি লিখেন-

“বিদ্যুৎ বন্যার বহ্নি বুকে পুরে হাঙরের মত
মেঘেরা চলেছে ডুবে আকাশের গহীন নদীতে
নি:শব্দ সঞ্চারে, জলে অগ্নিগর্ভ পাহাড়ের মত
বিপুল প্রতঙ্গ, আর অবরুদ্ধ কোটি ধমনীতে
জাগে এক চাঙ্গা ঝড় ঘণীভূত বাষ্পের ধোঁয়ায়।”


কবি ফররুখ আহমদ এর সাহিত্যে কবি মাইকেল মধুসূধনের প্রভাব ছিল। কিন্তু পার্থক্য ছিল মাইকেলের পক্তি ছিল চৌদ্দমাত্রার ফররুখের সনেটে পক্তি ছিল আঠার মাত্রার। ফররুখের কৃতিত্ব এখানেই এবং এটা তার প্রাথমিক কবিতায় স্পষ্টভাবেই দেখা যাচেছ যে দীর্ঘ পয়ারের মধ্যে তিনি শুধু ঋজুতাই নয়, শুধু ধ্বনির ঐশ্বর্যই নয়, প্রয়োজন মতো আনতে পারেন দীর্ঘশ্বাসের আকুতি, জাগাতে পারেন শব্দের তরল কল্লোল- যেমন ‘প্রতীক্ষা’ কবিতায় কবি বলেন,

“কোথায় অনেক দূরে নামিয়াছে বৃষ্টির কোমল
সজল সহানুভূতি-কোথায় জমেছে যেন মেঘ
দূর বহু দূর হতে বাতাসের সাথে সেই জল
স্বপন আশ্বাস আনে। কবে তুমি দেখা দেবে মেঘ।”


মাইকেল তার কাব্যকাহিনী গড়ে তোলতে যেমন মহাভারত ও রামায়ানের মতো গ্রন্থ বেছে নিয়েছিলেন, ফররুখ তেমন সামনে টেনেছিলেন বিশ্ব মুসলিম সাহিত্য, আলিফ লায়লা ও হাতেম তাই এর মতো কাহিনীর। ঊনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের গোড়ার দিকে মুসলিম জাগরণের যে স্রোত প্রবাহিত হয়, তিনি তার প্রত্যক্ষ ফসল। সেই সাথে গেয়েছেন মানবতার জয়গান। আযানের মতো উদান্ত স্বরে তার আহবান ধ্বনিত হয়েছে জাতির উদ্দেশ্যে।


“সাত সাগরের মাঝি’ কাব্য গ্রন্থে ‘পাঞ্জেরী’
শিরোনামে কবি বলেন,
“রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?

এখনো তোমার আসমান ভরা মেঘে?
সেতারা, হেলাল এখনো উঠেনি জেগে?
তুমি মাস্তুলে, আমি দাঁড় টানি ভুলে,
অসীম কুয়াশা জাগে শূন্যতা ঘেরি।”

এইখানে আলোচ্য বিষয় হচ্ছে, মাইকেল যদি মহাভারত, রামায়ণ নিয়ে তার কাব্য রচনার মূল বিষয় নির্ধারণ করতে পারেন, তবে ফররুখ কেন আলিফ লায়লা, হাতেম তাই বা মুসলিম সাহিত্যের গভীর বিষয় নির্ধারণ করতে পারবেন না! সমালোচকদের এক কেন্দ্রীক চিন্তা এখানে যুক্তিতে মোটেই টিকে না।
প্রথম দিকে কবি ফররুখ বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে তিনি মুসলিম রেনেসাঁর সমর্থক হয়ে পড়েন। ফররুখ তার লেখনিতে ‘মুহূর্তের কবিতায়’ বলেন,

“যখন শুনেছি আমি মৃত্যু আছে সূর্যেরও সমান
অগণন জ্যোতিষ্কের ভাগ্যলিপি মৃত্যু দিয়ে ঘেরা,
তখনি হয়েছে মনে এ আকাশ রহস্যের ডেরা,
তখনি হয়েছে মনে এ জীবন ক্ষণিকের গান।”

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রতি কবির সমর্থন ছিল অতি দৃঢ়। ধর্মীয় কুসংস্কার ও পাকিস্তানের অপরিণামদর্শী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে তার লেখা ছিল কঠোর। ১৯৬৬ সালে সিতারা-ই ইমতিয়াজ খেতাব প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ছিল তার অবিরাম সমর্থন।
১৯৩৭ সালে কবির কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় মোহাম্মদ হাবীবুল্লাহ বাহার সম্পাদিত বুলবুল পত্রিকায় শ্রাবণ সংখ্যায় ‘রাত্রি’ নামে এবং মোহাম্মদ আকরাম খাঁ সম্পাদিত মোহাম্মদীতে ‘পাপজনম’ কবিতা প্রকাশিত হয়।
ফররুখ প্রথম খ্যাতি অর্জন করেন ১৯৪৪ সালের দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে লেখা ‘লাশ’ কবিতার জন্য। সুকান্তের ‘অকাল’ পত্রিকায় প্রকাশিতÑ হয়। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘সাত সাগরের মাঝি’। ১৯৫২ সালে প্রকাশিত হয় কাব্যগ্রন্থ ‘সিরাজাম মুনীরা’। যে বিখ্যাত ‘লাশ’ কবিতায় কবি কি বলেন, আমরা কিছু অংশ শুনি:


“শাশ্বত মানব সত্তা মানুষের প্রাপ্য অধিকার
ক্ষুধিত মুখের গ্রাস কেড়ে নেয় রুধিয়া দুয়ার
মানুষের হাড় দিয়ে তার আজ গড়ে খেলাঘর
সাক্ষ্য তার পড়ে আছে মুখ গুঁজে ধরনীর পর।”


If a great Poet were to rise among the Mussulmans of India, he could write a magnificent epic on the death of Hossen and his brother. He could chlist the feelings of the whole race on his half.
অর্থাৎ ভারতে মুসলমানদের মধ্যে কোনো কবি জন্ম নিলে হোসেন ও তার ভাইয়ের মৃত্যু নিয়ে চমৎকার এক মহাকাব্য লিখতে পারতেন। রূপদান করতে পারতেন গোটা জাতির অনুভূতিকে। (মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ, পৃষ্ঠা-৫১)
বন্ধু রাজনারায়ণকে লেখা চিঠিতে আক্ষেপ করে কথাটা বলেছিলেন ইংরেজীতে মহাকবি- মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তার এই আক্ষেপ মোচনের দায় কাঁধে নিয়ে কেউ দন্ডায়মান হয়নি। কিন্তু মুসলিম সংস্কৃতিকে বাংলা সাহিত্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য আবির্ভাব ঘটেছিল একজন সাহিত্যিকের ফররুখ আহমদ। আহমদ বিন রুমি ২০১৯ সালে “পাঞ্জেরী: একজন ফররুখ আহমদের গল্প” শীর্ষক প্রবন্ধে নিপুণভাবে উল্লিখিত বিষয়টি টেনে এসেছিলেন।


কবি ফররুখ এক অসাধারণ কবি। ১৯৬৩ সালে ‘মুহূর্তের কবিতা’ সনেটগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ‘পাখীর বাসা’ ১৯৬৫ সালে প্রকাশের পর ১৯৬৬ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘হাতেম তা’য়ী’ প্রকাশের পর ইউনেস্কো পুরষ্কার ও আদমজী পুরস্কার লাভ করেন। বাংলা ভাষায় আরবী-ফারসী শব্দের ব্যবহারে অভিনবতœ ও মৌলিক আঙ্গীকে তাকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছে।
তাই কবির ভাষায় বলা যায়


“ভেঙে ফেলো আজ খাকের মমতা আকাশে উঠেছে চাঁদ
দরিয়ার বুকে দামাল জোয়ার ভাঙছে বালুর বাঁধ
ছিঁড়ে ফেলে আজ আয়েশী রাতের মখমল অবসাদ,
নতুন পানিতে হাল খুলে দাও, হে মাঝি সিন্দাবাদ।”


১৯৫৭ সালে পলাশীর করুণ ঘটনা ১৯৫৭ ব্রিটিশ বিরোধী আজাদী আন্দোলন, ১৯২৩ সালে তুরস্কে দীর্ঘকালের মুসলিম খেলাফতের অবসান প্রভৃতি কবিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। ইউরোপ যেমন পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতাব্দীতে গ্রিক ও রোমান শিক্ষা, শিল্প ও সভ্যতা থেকে অনুপ্রেরণা নেয়, তেমনি ফররুখ খুঁজে পেয়েছিলেন, নবম ও দশম শতকের বাগদাদ, কায়রো কর্ত্তোবার। তাই কবি রুমি, ফেরদৌস, জামী, কারবালা, শবেকদর সহজে তাকে তার কবিতার বিষয়বস্তু হয়ে উঠে। কবি কন্ঠে তাই আমরা শুনতে পাই- পুরাতন সকল ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে নতুন করে সমাজ ও রাষ্ট্রকে গড়তে-

“মোর জামাতের সকল স্বপ্ন ভেঙে ভেঙে হল চুর,
মিশে গেল মরু- বালুকায়-সাইমুমে,
ঝড় মৌসুমে চলো আজি মোরা গড়ি সেই কোহিতুর
কারিগর, তুমি থেকো না অসাড় ঘুমে।”


কবি নজরুলের যখন সাহিত্য জীবনের সমাপ্তি তখন কবি ফররুখের আগমন। নজরুল এসেছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতা, খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের সময়। ফররুখ এসেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, পাকিস্তান আন্দোলন ও দুর্ভিক্ষের করুণ অভিজ্ঞতা নিয়ে। আল্লামা ইকবালের ভাবশিষ্য নিজ জাতির সমস্যাকে চোখে আঙুল দিয়ে ফররুখ আমাদের দেখিয়ে তার লেখনির মাধ্যমে বলেছিলেন,


“হে মাঝি এবার তুমিও পেয়ো না ভয়
তুমিও কুড়াও হেরার পথিক তারকার বিস্ময়
ঝরুক এ ঝড়ে নারঙ্গী পাতা তবু পাতা অগণন
ভিড় করে সেথা জাগছে আকাশে হেরার রাজতোরণ।”


কবি ফররুখ ছিলেন সাম্যের কবি, দরিদ্রের কবি নিপীড়িত মানবতার কবি। স্বধর্ম আর স্বজাতির প্রতি ভালবাসা কবিকে কখনও বিশ্বমানবতার কল্যাণ কামনায় বিরত করেনি। সাম্যবাদ কিংবা গণতন্ত্রেও চরম উদ্দেশ্য সামাজিক শান্তি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা থেকে কবিকে বিরত করেনি। ফররুখ কবি জীবনে নিঃশ্বাসের মধ্যে সমস্যার মূল সমাধান খুজে পেয়েছিলেন । তাই তার কলম ও কন্ঠে বার বার অভাব, অভিযোগ, অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে ধ্বনিত হয়েছে। বিশ্ব মানবতার কন্ঠে কবি কন্ঠ বলে উঠে-


“লোহুতে পার্থক্য নাই বণি আদমের
শিরায় শিরায় আর ধমনীতে দেখি বহমান
এক রক্ত ধারা।”


ফররুখ ছিলেন অতি উঁচু মাপের আধুনিক কবি। পশ্চিমা আধুনিক কবিদের রচনার আঙ্গিক ও বিশুদ্ধতা ফররুখের কবিতায় দৃশ্যমান। কবি হাসান হাফিজুর রহমান ‘আধুনিক কবি ও কবিতা’ বই ১৯৯৩ সালে কবি সম্পর্কে বলেন, “ফররুখ আমাদের কাব্য সাহিত্যে আধুনিক উত্তোলণে প্রকৃত সাহায্যটা করেছেন তার কাব্যভাষা এবং অঙ্গিকের প্রয়োগে।”
চিত্রকল্প ও প্রতীকের ব্যবহারে ফররুখ ছিলেন অনন্য। তাই কবির ভাষায়-


“রাত্রির অগাধ বনে ঘোরে একা আদম-সুরত
তীব্রতর দৃষ্টি মেলে তাকায় পৃথিবী
জাগো জনতার আত্মা ওঠো। কথা কও।
কতোকাল আর তুমি ঘুমাবে নিসাড় নিস্পন্দ।”


কবি ফররুখ আহমদ ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। ১৯৫২ ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ, আইয়ুব শহীর বিরুদ্ধের গণআন্দোলন প্রভৃতি সকল স্তরে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তার লেখনি আমাদের সেই সময় অনেক বেশী অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের সকল সম্মান পেয়েছেন। একুশে পদক, বাংলা একাডেমী পদক, স্বাধীনতা পদক, আমজীপদ, ইউনেস্কো পদক সহ সকল মর্যাদাবান সম্মানে তিনি ভূষিত হয়েছিলেন।


কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধ ও পরবর্তী তার লেখনির মাধ্যমে যে তরুণ সমাজ সৃষ্টি করতে চেয়ে ছিলেন তাতে বেশ বেগ পেতে হয়। তিনি তখন আর সমাজের সঙ্গে কেন যেন মিলিয়ে বলে নিজকে ধরে রাখতে হোঁচট খেয়েছেন।


অর্থনৈতিক দৈন্যতা সকল কবি, সাহিত্যিকদের জীবনে থাকে। নজরুলের সবচেয়ে বেশী ছিল। কবি ফররুখও জীবনের শেষ অভাবের তীব্রতা বেশ অনুভব করেছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন স্বাধীনচেতা, আত্ম মর্যাদাবান ব্যক্তিত্ব, শির উঁচু করে পুরো জীবন কাটিয়েছেন। তখনকার সরকার ও সাহিত্যমোদী ব্যক্তিগণ ও তেমন কবিকে সহযোগীতা করে নাই। তবুও কবি আমাদের প্রিয়, তার সৃষ্টি বাংলা সাহিত্যে অমর। কালজয়ী। আমাদের ভবিষ্যত গড়ার অনুপ্রেরণার বাতিঘর।

Abul Quasem Haider
আবুল কাসেম হায়দার

সাবেক সহ সভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ, বিজিএমইএ , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:, অষ্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তিনি আজীবন সদস্য : এশিয়াটিক সোসাইটী বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমী, চট্টগ্রাম সমিতি, সন্দ্বীপ সমিতি ঢাকা ।

লেখক দৈনিক আজকের আওয়াজ ও সাপ্তাহিক প্যানোরামা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

4 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments