Pension Scheme Bangladesh

সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি
একটি ভালো উদ্যোগ

একটি ভালো উদ্যোগ। দেশের মানুষের কল্যাণে এই উদ্যোগ সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য। তবে নির্ভর করবে এদেশের বাস্তবায়নের উপর মানুষ কতটুকু উপকার পায়। উপকার পাওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা। উন্নত দেশসমূহে এই প্রকল্প ভিন্ন নামে ভিন্নভাবে রয়েছে। পৃথিবীর সকল উন্নত দেশের মানুষের অবসরকালিন ভাতা রয়েছে। সে সরকারী চাকুরি করুক বা না করুক- ব্যবস্থা সকলের জন্য রয়েছে। আমাদের দেশে এখন চালু হতে যাচ্ছে। প্রথম দিনই ১ হাজার ৬ শত ৬৬ জনে প্রায় ৮৭ লক্ষ টাকা সমপরিমাণ অর্থ সংগ্রহ হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিকট এইটি আকর্ষণীয় হবে মনে হচ্ছে।
দেশের চার শ্রেণির প্রায় ১০ কোটি মানুষের কথা বিবেচনায় রেখে চালু করা হচ্ছে সর্বজনীন পেনশন-ব্যবস্থা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী ২০২০ সালে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ এবং ২০৪১ সালে তাঁদের সংখ্যা হবে ৩ কোটি ১০ লাখ।


এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে একটি টেকসই ও সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তাকাঠামোর আওতায় আনতে এবং নিম্ন আয় ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত সমাজের ৮৫ শতাংশ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে দেশে প্রথমবারের মতো সর্বজনীন পেনশন-ব্যবস্থা (স্কিম) চালু করছে সরকার।
সর্বজনীন পেনশন স্কিমের আওতায় কত মানুষ পেনশন সুবিধার আওতায় আসবেন, সে বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল জানান, পেনশন স্কিমের মাধ্যমে ১৮ বছরের বেশি দেশে-বিদেশে থাকা ১০ কোটি মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার চিন্তা রয়েছে সরকারের। পেনশন কর্তৃপক্ষ বলছে, মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। ধীরে ধীরে বাড়ছে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা এবং তাঁদের নিরাপত্তাহীনতা। আর এ কারণেই চালু করা হচ্ছে সর্বজনীন পেনশন-ব্যবস্থা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৭ আগস্ট এ পেনশন পদ্ধতি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর দেশে বিদেশে বসবাসরত ১৮ বছরের বেশি বয়সী যে কোনো বাংলাদেশি সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আসেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, অর্থসচিব ফাতিমা ইয়াসমিন, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কবিরুল ইজদানী খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


চারটি আলাদা স্কিম নিয়ে সর্বজনীন পেনশন-ব্যবস্থার যাত্রা শুরু হয়েছে। এগুলো হচ্ছে প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা। প্রবাস স্কিমটি শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য। প্রগতি স্কিম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীদের জন্য। সুরক্ষা স্কিম রিকশাচালক, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি ইত্যাদি স্বকর্মে নিয়োজিত নাগরিকদের জন্য। আর সমতা স্কিম নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য।
পেনশন-ব্যবস্থা পরিচালনা ও বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা অর্থ বিভাগের আওতাধীন জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট চালু হয়েছে গতকাল বুধবার। ওয়েবসাইটের ঠিকানা www.upension.gov.bd। এতে বলা হয়েছে, ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অংশগ্রহণ করে আপনার ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন।’ ওয়েবসাইটের ঠিকানায় পেনশন স্কিমগুলো সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য উল্লেখ করা আছে। দেশের ভেতরে আমাদের ব্যাংকের ১ হাজার ২২৯টি শাখাই সর্বজনীন পেনশন-ব্যবস্থার সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। পেনশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ ব্যাপারে আমাদের চুক্তি হয়েছে ।


সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আফজাল করিম বলেন, পেনশন-ব্যবস্থার আওতায় আসতে গেলে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) থাকতে হবে। প্রবাসী বাংলাদেশি যাঁদের এনআইডি নেই, তাঁরা পাসপোর্টের ভিত্তিতে পারবেন। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এনআইডি সংগ্রহ করে পেনশন কর্তৃপক্ষের কাছে তা জমা দিতে হবে।


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৭ আগস্ট এ পেনশন পদ্ধতি উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পর দেশে-বিদেশে বসবাসরত ১৮ বছরের বেশি বয়সী যেকোনো বাংলাদেশি সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার আওতায় আসতে পারবেন আজ থেকেই। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, অর্থসচিব ফাতিমা ইয়াসমিন, জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কবিরুল ইজদানী খান প্রমুখ উপস্থিত থাকবেন।

পেনশন-ব্যবস্থা চালুর পটভূমি
পেনশন-ব্যবস্থা চালু হলেও ২০১৫ সালে প্রয়াত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এ ব্যাপারে প্রথম উদ্যোগ নেন। ২০১৬ সালে ভারত ঘুরে এসে অর্থ বিভাগের একটি দল একটি ধারণাপত্র তৈরি করে। তবে কাজটি আবদুল মুহিত শেষ করে যেতে পারেননি। নতুন করে এ আলোচনা গতি পায় ২০২২ সালে এবং এ বছর আরেকটি ধারণাপত্র তৈরি করে অর্থ বিভাগ। এরপর এ বছরের ৩১ জানুয়ারি সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাপনা আইন এবং আইনের আওতায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়।


চলতি অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে একটি টেকসই ও সুসংগঠিত সামাজিক নিরাপত্তাকাঠামোর আওতায় বৃদ্ধকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে জাতীয়ভাবে একটি সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি প্রবর্তনের অঙ্গীকার করেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে সরকার জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্র প্রণয়ন করে। এতে দেশে একটি ব্যাপকভিত্তিক সমন্বিত অংশগ্রহণমূলক পেনশন-ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়।
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হতে গেলে পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে গিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। প্রথমেই একটি পাতা আসবে, যেখানে লেখা থাকবে এ কথাগুলো, ‘প্রত্যয়ন করছি যে আমি সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নই। সর্বজনীন পেনশন স্কিমবহির্ভূত কোনো ধরনের সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা গ্রহণ করি না।


জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে পেনশন-ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রত্যেক চাঁদাদাতার জন্য একটি আলাদা পেনশন হিসাব থাকবে। চাঁদাদাতা ৬০ বছর বয়স থেকে পেনশন পাওয়া শুরু করবেন। ৭৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মারা গেলে তাঁর নমিনি মূল পেনশনারের বয়স ৭৫ হওয়ার বাকি সময় মাসিক ভিত্তিতে পেনশন পাবেন। ১০ বছর চাঁদা দেওয়ার আগে কেউ মারা গেলে জমা হওয়া অর্থ মুনাফাসহ ফেরত পাবেন নমিনি। পেনশনের অর্থ বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য হবে এবং মাসিক পেনশনের অর্থ আয়করমুক্ত থাকবে।

যেভাবে নিবন্ধিত হওয়া যাবে
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হতে গেলে পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে গিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। প্রথমেই একটি পাতা আসবে, যেখানে লেখা থাকবে এ কথাগুলো, ‘প্রত্যয়ন করছি যে আমি সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নই। সর্বজনীন পেনশন স্কিমবহির্ভূত কোনো ধরনের সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা গ্রহণ করি না। আমি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কোনো ধরনের ভাতা গ্রহণ করি না।’


এরপর ‘আমি সম্মত আছি’ অংশে ক্লিক করলে দ্বিতীয় পাতায় গিয়ে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। এখানে আবেদনকারীকে প্রবাস, সমতা, সুরক্ষা বা প্রগতি-এই চার স্কিমের মধ্য থেকে প্রযোজ্য স্কিম বাছাই করতে হবে। একই সঙ্গে ১০, ১৩ বা ১৭ সংখ্যার এনআইডি নম্বর, জন্ম তারিখ, মোবাইল নম্বর, ই-মেইল আইডি লিখে দিতে হবে। এরপর পাতার নিচের দিকে থাকা ক্যাপচা লিখে পরের পাতায় যেতে হবে-


নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার তৃতীয় ধাপে আসবে ব্যক্তিগত তথ্যের পাতা। এ পাতায় এলে ব্যক্তির এনআইডি অনুযায়ী এনআইডি নম্বর, ছবি, আবেদনকারীর বাংলা ও ইংরেজি নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসবে (যেহেতু আগের পাতায় এ তথ্যগুলো দেওয়া আছে)।


তবে এখানে আবেদনকারীর বার্ষিক আয় লিখতে হবে এবং পেশা, নিজ বিভাগ, জেলা ও উপজেলার নাম নির্বাচন করতে হবে। পেশা বাছাইয়ের ঘরে শিক্ষক, বেসরকারি চাকরিজীবী, ছোট ব্যবসায়ী, ব্যবসা, দিনমজুর, আইনজীবী, সাংবাদিক ইত্যাদি পেশার উল্লেখ আছে। সেখান থেকে নিজের পেশা নির্বাচন করতে হবে। সব লেখা সম্পন্ন হলে পরের ‘স্কিম তথ্য’-এর পাতায় যেতে হবে।


স্কিম তথ্যের পাতায় এলে সেখান থেকে মাসিক চাঁদার পরিমাণ ও চাঁদা পরিশোধের ধরন বাছাই করতে হবে। চাঁদা পরিশোধের ধরনের মধ্যে মাসিক, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক-এ তিন অপশন রয়েছে। এরপর ব্যাংক তথ্যের ধাপে যেতে হবে।

ব্যাংক তথ্যের পাতায় আবেদনকারীর ব্যাংক হিসাবের নাম ও নম্বর, হিসাবের ধরন (সঞ্চয়ী অথবা চলতি), রাউটিং নম্বর, ব্যাংকের নাম ও ব্যাংকের শাখার নাম লিখতে হবে। এরপর পরবর্তী নমিনি তথ্যের পাতায় যেতে হবে।


এরপর ‘আমি সম্মত আছি’ অংশে ক্লিক করলে দ্বিতীয় পাতায় গিয়ে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। এখানে আবেদনকারীকে প্রবাস, সমতা, সুরক্ষা বা প্রগতি-এই চার স্কিমের মধ্য থেকে প্রযোজ্য স্কিম বাছাই করতে হবে।

নমিনি তথ্যের পাতায় গিয়ে নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে নমিনিকে যুক্ত করতে হবে। এ সময় নমিনির মোবাইল নম্বর, নমিনির সঙ্গে সম্পর্ক, নমিনির প্রাপ্যতার হারের (একাধিক নমিনি হলে) তথ্য দিয়ে সর্বশেষ ‘সম্পূর্ণ ফরম’ ধাপে যেতে হবে।


এটিই নিবন্ধনের শেষ ধাপ। এ ধাপে আগে পূরণ করা ব্যক্তিগত তথ্য, স্কিম তথ্য, ব্যাংক তথ্য ও নমিনি তথ্য দেখানো হবে। সেখানে কোনো ভুল থাকলে আবার শুরু থেকে গিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে হবে। আর সব তথ্য ঠিক থাকলে তাতে সম্মতি দিয়ে আবেদনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এ সময় চাইলে সম্পূর্ণ আবেদনটি ডাউনলোডও করতে পারবেন আবেদনকারী।


নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার তৃতীয় ধাপে আসবে ব্যক্তিগত তথ্যের পাতা। এ পাতায় এলে ব্যক্তির এনআইডি অনুযায়ী এনআইডি নম্বর, ছবি, আবেদনকারীর বাংলা ও ইংরেজি নাম, পিতার নাম, মাতার নাম, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসবে (যেহেতু আগের পাতায় এ তথ্যগুলো দেওয়া আছে)।

আপাতত সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে নিবন্ধন
গত ১৭ আগস্ট,২০২৩ থেকে অনলাইন ফরম পূরণ অথবা সরাসরি সোনালী ব্যাংকের যেকোনো শাখায় গিয়ে নিবন্ধন করা যাবে এবং চাঁদা দেওয়া যাবে। মোবাইলে আর্থিক সেবা (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও চাঁদা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।


পেনশন কর্তৃপক্ষের সূত্রগুলো জানায়, চারটি স্কিমের জন্য আলাদা চারটি হিসাব খোলা হয়েছে সোনালী ব্যাংকে। এ হিসাবগুলোতে চাঁদা জমা হবে। সোনালী ব্যাংক দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরে অন্য ব্যাংকও যুক্ত হবে।


প্রবাস স্কিমে ৭, সাড়ে ৭ ও ১০ হাজার টাকা; প্রগতি স্কিমে ২, ৩ ও ৫ হাজার টাকা এবং সুরক্ষা স্কিমে ১, ২, ৩ ও ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শুধু সমতা স্কিমে চাঁদার হার একটি, আর তা হচ্ছে এক হাজার টাকা। এর মধ্যে চাঁদাদাতা ৫০০ ও সরকার ৫০০ টাকা করে দেবে।


সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আফজাল করিম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের ভেতরে আমাদের ব্যাংকের ১ হাজার ২২৯টি শাখাই সর্বজনীন পেনশন-ব্যবস্থার সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। পেনশন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ ব্যাপারে আমাদের চুক্তি হয়েছে।’

সোনালী ব্যাংকে কারও হিসাব থাকুক বা না থাকুক, নির্ধারিত ফরম পূরণ করে এ ব্যাংকের মাধ্যমে ১৮ বছরের বেশি বয়সী যে কেউ পেনশন স্কিমের চাঁদা দিতে পারবেন বলে জানান আফজাল করিম।

এখন যা করণীয়:
১. সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচী চালুর জন্য নিঃসন্দেহে সরকার অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। এটি হওয়ায় সরকারের অর্থায়নের ও ভালো একটি উৎস হলো। তখন ভালো একটা তহবিল তৈরি হবে। তবে এ তহবিলের অর্থ-সুষ্ঠভাবে বিনিয়োগ করে মুনাফা অর্জন করতে না পারলে সরকারের জন্য তা বড় বোঝা হয়ে উঠবে। সঠিক বিনিয়োগ এই প্রকল্পের অর্থ দেশের মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।
২. এই প্রকল্পের কর্তৃপক্ষ হতে হবে সৎ, কর্মঠ, ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের নিয়ে গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে মানুষের লাভের চেয়ে ভোগান্তি বাড়বে। দুর্নীতি, অনিয়ম এই প্রকল্পে কোনভাবে আক্রান্ত না হয় তার জন্য শুরু থেকে সজাগ থাকতে হবে।
৩. এই প্রকল্পের কিস্তিকে চাঁদা বলা হয়েছে। চাঁদা না বলে কিস্তি বলতে শুনতে ভাল শোনা যাবে। আশা করি কর্তৃপক্ষ শব্দটি নিয়ে চিন্তা করবেন।
৪. এই প্রকল্পের লভ্যাংশ সুদ না সুদবিহীন তা পরিষ্কার করা দরকার। সুদ হারাম। তাই প্রকল্পের হারাম মুক্ত প্রকল্প করার উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ ইসলামী চিন্তা ও চেতনায় বিশ্বাসী। তাই সুদবিহীন দশের অধিক শাখা বাংলাদেশে চালু হয়েছে। সুদ ইসলামী ধর্ম মোতাবেক হারাম। সুদ দেওয়া ও নেওয়া উভয়-সমান অপরাধ। তাই আল্লাহ পাকের এই নির্দেশ পালন প্রতিটি মুসলমানের ঈমানের দাবী। সরকারকে সেই বিষয়টি মনে রেখে প্রকল্প তৈরি করা উচিত।
৬. বর্তমানে মোট- ছয়টি স্কিমের মধ্যে চারটি চালু করা হয়েছে। বাকী দুইটি পরে চালু করা হবে। তাছাড়া অর্থ বিভাগ সূত্রে বলা হয়েছে যে, ছুটির পর চালু করা হবে- শ্রমিক চেনার জন্য একটি, শিক্ষার্থীদের জন্য অন্য একটি। ২০৩৫ বা ২০৪১ সাল থেকে সরকারি কর্মচারী এবং স্বায়ত্বশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের জন্য ও সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি উন্মুক্ত হবে। এইটি একটি ভালো উদ্যোগ।
৬. এই প্রকল্পের প্রচারের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অনেক বেশী। ইতিমধ্যে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট টঢ়বহংরড়হ.মড়া.নফ চালু করা হয়েছে। ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে প্রকল্পটি সর্বস্তরের জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। পত্র-পত্রিকা, টিভি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, প্রবন্ধ-নিবন্ধে প্রকল্পটিকে জনগণের করে তুলতে হবে। তবেই বৃহৎ জনগোষ্ঠি উপকৃত হবে, সরকার ও এই অর্থের বিরাট সৎ ব্যবহারের সুযোগ পাবে। তবে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।
৭. শ্রমবাজারের ১০ কোটি মানুষের কথা বলা হলেও বেকারদের কোনো স্কিম নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০১৮ সালের শ্রমশক্তি জীবিদের মতে ৪ কোটি ৮২ লক্ষ প্রকৃত বেকার, যাদের স্থায়ী কর্ম ও সঞ্চয়ের মতো কোন আয় নাই। এই বেকারদের বিষয় নতুন করে বিবেচনায় নিতে হবে। এদের বয়স আবার ১৮ থেকে ৩৫ পর্যন্ত।
৮. অতি দরিদ্র ‘সমতা’ স্কিমে চাঁদার পরিমাণ মাসে ১ হাজার টাকা, গ্রাহক মাসে ৫০০ টাকা করে দেবেন। বাকী ৫০০ টাকা সরকার দেবেন। ১০ বছর পর ঐ ব্যক্তি মাসে পেনশন পাবেন ১ হাজার ৫৩০ কোটি মাত্র। এই অর্থ দিয়ে এই ব্যক্তিভাবে খরচ চালাবে। ডলারের মুদ্রাস্ফীতি ঘটায় বাংলাদেশের দরিদ্র ও অতি দরিদ্রসীমা ভুল, ভারতের মতো ‘পোভার্টি লাইন’ পুননির্ধারণ করা প্রয়োজন।
৯. সুরক্ষা স্কিমে স্বকর্মে নিয়োজিত বিভিন্ন পেশার সক্ষমতা সমান নয়। দেশের কৃষক, রিকশাচালক, নির্মাণ ও পরিবহন শ্রমিক, ভাসমান শ্রমিক, বস্তিবাসীর পক্ষে প্রতি মাসে এক হাজার বা তার অধিক চাঁদা দেয়া অসম্ভব। তাই এই ক্ষেত্রে সরকারের প্রকৃত টাকার পরিমাণ আরও অনেক বেশি বৃদ্ধি করতে হবে।
১০. এই স্কিম শুধু সরকারী ব্যাংকে রাখা হয়েছে। সরকারী ব্যাংকসমূহে দুর্নীতিতে ভরপুর। সরকার প্রতিবছর বাজেট থেকে সরকারী ব্যাংকসমূহে মূলধন সরবরাহ করতে হয়। তাই মানুষের আস্থা নাই। বেসরকারী ভাল ব্যবস্থাপনা ব্যাংকে এই স্কিম চালু করার সুযোগ রাখা প্রয়োজন।

Abul Quasem Haider
আবুল কাসেম হায়দার

সাবেক সহ সভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ, বিজিএমইএ , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:, অষ্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তিনি আজীবন সদস্য : এশিয়াটিক সোসাইটী বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমী, চট্টগ্রাম সমিতি, সন্দ্বীপ সমিতি ঢাকা ।

লেখক দৈনিক আজকের আওয়াজ ও সাপ্তাহিক প্যানোরামা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

5 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments