মনীষী Archives - চিন্তা ভাবনা https://chintavabna.com/tag/মনীষী/ দেশ ও মানুষের জন্য নিবেদিত Sat, 12 Sep 2026 15:52:11 +0000 en-US hourly 1 https://wordpress.org/?v=7.1.2 https://chintavabna.com/wp-content/uploads/2023/09/cropped-cropped-cropped-cropped-chintavabna_logo-3-70x70.png মনীষী Archives - চিন্তা ভাবনা https://chintavabna.com/tag/মনীষী/ 32 32 ড. মুহাম্মদ ইউনূস আমাদের গর্ব https://chintavabna.com/dr-muhammad-yunus-our-pride/ https://chintavabna.com/dr-muhammad-yunus-our-pride/#respond Sat, 12 Sep 2026 15:19:45 +0000 https://chintavabna.com/?p=1202 ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর ‘গরিবের ব্যাংক’ প্রবন্ধে বলেন, “দারিদ্র্য বিষয়ে আমি সম্পৃক্ত হয়েছি নীতি-নির্ধারক বা গবেষক হিসেবে বরং আমার চারপাশে দারিদ্র্যের প্রবল উপস্থিতির কারণে। চারপাশে…

The post ড. মুহাম্মদ ইউনূস আমাদের গর্ব appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর ‘গরিবের ব্যাংক’ প্রবন্ধে বলেন, “দারিদ্র্য বিষয়ে আমি সম্পৃক্ত হয়েছি নীতি-নির্ধারক বা গবেষক হিসেবে বরং আমার চারপাশে দারিদ্র্যের প্রবল উপস্থিতির কারণে। চারপাশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশে শ্রেণিকক্ষে অর্থনীতির মূল্যবান তত্ত্বগুলো পড়ানো আমার জন্য কষ্টকর হয়ে উঠে। আমি চাইছিলাম আমার চারপাশের মানুষগুলোর সাহায্যে কিছু একটা করতে। এখানেই আমি দেখতে পাই দরিদ্র মানুষকে টিকে থাকার জন্য অতি সামান্য অর্থ জোগাড়ে কতটা প্রানান্তকর সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়।”

“Some are born great,
Some achieve greatness and
Some have greatness thrust
Upon them.”
-William shakespeare.

আজ যারা তরুণ, যারা আগামীর ইউনূস, আগামীর আইডল তাদের অনুপ্রেরণার জন্য তাঁর জীবন গাঁথা- ২১ জুন
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্ম/১৯৪০ সালে, চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বথুয়া গ্রামে। তাঁর পিতা হাজী দুলা মিয়া সওদাগর ও মাতা সুফিয়া খাতুন। তিনি ছিলেন ১৪ ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয়। ভাইবোনদের পাঁচজনই মারা যায় শৈশবে। ১৯৪৭ সালে চলে আসেন চট্টগ্রাম শহরে। প্রথম পড়াশোনা গ্রামের স্কুলেই। এরপর লামাবাজার প্রাইমারি স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে পড়েছেন। এখান থেকেই এস. এস. সি পাস করেন মেধা তালিকায় ১৬তম স্থান নিয়ে।
স্কুল জীবনে স্কাউট ছিলেন। ১৯৫৫ সালে কানাডার ওয়ার্ল্ড স্কাউট জাম্বোরিতে অংশগ্রহণ করেন। চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনার সময় সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও অংশ নেন। নাটকে অভিনয়ের জন্য পুরস্কৃত হন।
১৯৫৭ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে। সেখান থেকেই ১৯৬০ সালে বি. এ ও ১৯৬১ সালে নেন এম. এ ডিগ্রি। গ্র্যাজুয়েশনের পর যোগ দেন অর্থনীতি ব্যুরোতে এবং গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করেন প্রফেসর নুরুল ইসলাম ও রেহমান সোবহানের অধীনে।

১৯৬১ সালে চট্টগ্রাম কলেজে অর্থনীতি বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। এরপর চলে যান আমেরিকা। ১৯৬৯ সালে ভ্যানডার বিল্ট ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করেন। ১৯৬৯ থেকে ‘৭২ পর্যন্ত মিডল টেনিসি স্টেট ইউনির্ভার্সিটিতে অর্থনীতির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন।
এরপর বাংলাদেশে এসে অর্থনীতির প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে।
১৯৭৪ সালে প্রথম ক্ষুদ্র ঋণের প্রবর্তন করেন। একই বছর প্রতিষ্ঠা করেন তেভাগা খামার এবং গ্রামীণ ব্যাংক।

১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছিল, তখন আমেরিকায় পড়াশোনা করতেন গরিবের এই ব্যাংকার। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গড়তে সুদূর আমেরিকায় নিরলস কাজ করে গেছেন তিনি। সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের অধিকারী এই বাংলাদেশি সেখানে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশি নাগরিক কমিটি। চালু করেন বাংলাদেশ তথ্য কেন্দ্রও। আমেরিকার তৎকালীন পাকিস্তানি দূতাবাসে কর্মরত বাংলাদেশি অফিসারদের সেখান থেকে বের হবার জন্য সাহায্য করেন। সদস্য ছিলেন বাংলাদেশ ডিফেন্স লিগেরও। এ দলটি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র ও অন্যান্য সাহায্য সহযোগিতা দিতো।

শুরুর কথাঃ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্ম ১৯৪০ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর বথুয়া গ্রামে। চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে এস.এস.সি পাস করেন ১৬তম স্থান নিয়ে। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে বি.এ এবং ১৯৬১ সালে এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজের অর্থনীতি বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে ভ্যানডার বিল্ট ইউনিভার্সিটি হতে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৯-১৯৭২ সাল পর্যন্ত মিডল টেনিসি স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির এ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর হিসেবে কাজ করেন। এরপর বাংলাদেশে এসে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির প্রফেসর হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪ সালে প্রথম ক্ষুদ্র ঋণের প্রবর্তন করেন। একই বছর প্রতিষ্ঠা করেন তেভাগা খামার এবং গ্রামীণ ব্যাংক। অবশেষে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক গত ১৩ অক্টোবর ২০০৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। গত কয়েক বছর যাবৎ গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন। দেশের আপামর জনসাধারণ সেই শুভ ক্ষণটির জন্য অপেক্ষা করছিলেন অধীর আগ্রহে। অবশেষে তা বাস্তব রূপ লাভ করল। নোবেল পুরস্কার পেলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাই এটি কোন বিস্ময় নয়। বরং প্রত্যাশিত একটি প্রাপ্তি। প্রকাশ্যে যারা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেনা; গর্বে তাদের বুকও ভরে গেছে।
অর্ধেক পুরস্কার গ্রামীণ ব্যাংকেরঃ মজার ব্যাপার হলো একজন অর্থনীতিবিদ হয়েও শান্তি তে নোবেল পুরস্কার পাওয়া বিশ্বে এ প্রথম। তাও গ্রামীণ ব্যাংকের মত একটি অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানকে সাথে নিয়ে। কেননা প্রথমত রাজনীতিবিদরাই এ পুরস্কার পেয়ে থাকেন। শান্তিতে নোবেল জয়ের আনন্দ আরো বাড়িয়ে তুলেছে এদেশের প্রায় ৬৬ লক্ষ নারী। এ পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে এদেশের অবলা নারী সমাজ প্রমাণ করল তারা কতটা কতটা সৎ, পরিশ্রমী এবং আত্মবিশ্বাসী। তারা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে উপযুক্ত নেতৃত্ব ও সুযোগ পেলে বিশ্বের ৩০০ কোটি নারীর মধ্যে তারাও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
গ্রামীণ ব্যাংকের ৯৪ শতাংশ মালিকানা এর নারী ঋণ গ্রহীতাদের এবং বাকীটা সরকারের। এ ব্যাংকের ১৩ সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা বোর্ড আছে। সেখানে ৯ জন সদস্য ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। এরা সবাই গ্রামীণ ব্যাংকের ঋণগ্রহীতা সদস্য। বাকী ৪ জনের মধ্যে ৩ জনকে মনোনয়ন দেয় সরকার।

যে কারণে শান্তিতে নোবেলঃ গত কয়েক বছর যাবৎ গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূস অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন। কারণ তিনি একজন অর্থনীতিবিদ এবং গ্রামীণ ব্যাংকও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান। গত বছর অর্থনীতিবিদদের সম্ভাব্য তালিকায় তার নামও ছিল এমন খবর বিভিন্ন পত্রিকা প্রকাশ করে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে এ বছর তাকে পুরস্কার দেয়া হলো শান্তিতে। এতে অনেকে বিস্মিতও হয়েছেন। কেননা শান্তিতে নোবেল পাওয়ার জন্য যেসব ব্যাকগ্রাউন্ড কাজ করে যেমন-রাজনৈতিক সংঘাত, হানাহানি বা যুদ্ধ নিরসনে অবদান রাখা প্রভৃতি ক্ষেত্রে ড. ইউনূসের তেমন একটা ভূমিকা খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে ড. মুহাম্মদ ইউনূস অর্থনীতির বদলে শান্তিতে কেন নোবেল পেলেন। তবে অসলোতে নোবেল কমিটির সাইটেশানে এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। সেখানে ড. ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচীর সব কৃতিত্বকে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার অনিবার্য শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরো বলা হয় দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হবার জন্য জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ যদি পথের সন্ধান না পায় তা হলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেকে একজন পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রমাণ করেছেন। শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্য অনেক দেশের কোটি কোটি মানুষের কল্যাণে তিনি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন। কোন জামানত ছাড়াই ঋণদান একটি অসম্ভব ধারণা ছিল। দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রথম এবং প্রধানতম ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন।

নোবেল কমিটির সাইটেশানে আরো বলা হয়, যেসব দেশে বিশেষ করে মহিলারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন, সেই সব সমাজে মুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে ক্ষুদ্র ঋণের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

জোবরার সেই ৮৫৬ টাকা থেকে এখন ২৯ হাজার কোটি টাকাঃ চট্টগ্রামের একটি অখ্যাত গ্রাম জোবরা থেকে শুরু হয়েছিল ড. ইউনূসের ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচী। ১৯৭৬ সালে মাত্র ৮৫৬ টাকা দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে জোবরা গ্রামে মাত্র ৪২ জন মহিলার মধ্যে এ ঋণ বিতরণ করে গ্রামীণ ব্যাংক মডেলের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়। গত ৩০ বছরে এর সদস্য সংখ্যা বেড়ে হয় প্রায় ৬৬ লাখ এবং পুঁজির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৯ হাজার কোটি টাকায়। গ্রামীণ ব্যাংকের এ প্রবৃদ্ধিকে অনেকে বিস্ময়কর বলে মনে করেন। একটি মাত্র শাখা নিয়ে কাজ শুরু করলেও বর্তমানে এর শাখা ২,২২৬টি।
রবীন্দ্রনাথ থেকে ড. ইউনূসঃ ২০০৬ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর এ উপমহাদেশের মোট তিন বাঙ্গালী এ মর্যাদাবান পুরস্কার পেলেন। অন্য দু’জন হলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে এবং অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিতে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নোবেল প্রদানের সময় নোবেল কমিটি তাকে অভিহিত করেছিল ভারতীয় চেতনার অনন্য অগ্রদূত হিসেবে। সাহিত্যের প্রায় সবক্ষেত্রে অতুলনীয় অবদানের জন্য তিনি সমাদৃত ছিলেন। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের কর্ম গভীরভাবে সমাদৃত হয়েছে এই বাঙ্গালী চেতনায়। তার পৈতৃক নিবাসও বাংলাদেশে। অর্থশাস্ত্রে মৌলিক অবদানের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল পাওয়ার পর তিনি এসেছিলেন বাংলাদেশে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও আজকের বাংলাদেশঃ ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রমাণ করলেন দরিদ্র মানুষের কল্যাণ তারা নিজেরা করতে পারে। আজকে বাংলাদেশে যে কয়টি সমস্যা বিরাজমান তার মধ্যে প্রধানতম সমস্যা হচ্ছে যোগ্য, সৎ ও নিষ্ঠাবান নেতৃত্বের অভাব। রাজনীতি থেকে সমাজের সর্বত্র সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাব আমরা তিলে তিলে অনুভব করছি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যোগ্য ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তার দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচী একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে রূপ লাভ করেছে। তার এ সাহসী উদ্যোগ ও নতুন দিক নির্দেশনা নোবেল জয়ের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক মুক্তি লাভের জন্য সঠিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। ফর্মূলা যতই কার্যকরী হোক যোগ্য নেতৃত্ব না হলে তা ফলপ্রসূ হয়না। তাই ড. মুহাম্মদ ইউনূস বেশ কিছুদিন ধরে বলে বেড়াচ্ছেন রাজনৈতিক নেতৃত্বে পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি মনে করেন রাজনৈতিক নেতা নেত্রীর গুণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশী। দেশের দ্বিতীয় প্রধান সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সে ব্যক্তি যিনি অন্যায় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। দুর্নীতি মুক্ত সমাজ পরিচালনা তার স্বপ্ন। দারিদ্র্য মুক্তির যে স্বপ্ন তার প্রথম ধাপ তিনি পূরণ করেছেন গ্রামীণ ব্যাংকের মাধ্যমে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যেভাবে দুর্নীতি ছড়িয়ে আছে তা থেকে মুক্তির জন্য সামাজিক আন্দোলন দরকার। ড. মুহাম্মদ ইউনূস সে আন্দোলনে বিশ্বাসী। তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে প্রতীয়মান হয় একজন দুর্নীতি মুক্ত মানুষ দুর্নীতি মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। সবার সংঘবদ্ধ প্রয়াসের মাধ্যমে দুর্নীতি মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য সর্বপ্রথম সবার নিজেকে দুর্নীতি মুক্ত হবার শপথ নিতে হবে। আত্মবিশ্বাসী জাতি হিসেবে গড়ে উঠার প্রতীক ড. মুহাম্মদ ইউনূস : ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সবচেয়ে বড় অবদান তিনি জাতিকে আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে উঠার স্বপ্ন দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। তার এ প্রয়াস, আমরা যে ক্ষুদ্র জাতি নই; তাই প্রমাণ করেছে। এক সময় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে বাংলাদেশের জিডিপিতে গ্রামীণ ব্যাংকের অবদান কত? উত্তরে তিনি বলেছিলেন মাত্র ১.৮ শতাংশ। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় অবদান এটি ৬৬ লক্ষ পরিবারকে আত্মবিশ্বাসী করেছে। এমনকি যারা এক সময় ভিক্ষা করত তাদের ছেলে মেয়েরা এখন স্কুলে যাচ্ছে।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক আইসিটি কনফারেন্স হয়ে গেল। বহু দেশী বিদেশী অতিথি এতে অংশ নেয়। তারা সবাই এদেশের অমিত সম্ভাবনার কথা বলেন। আর এ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন একজন যোগ্য ও চ্যাম্পিয়ন ব্যক্তির। যিনি দেশকে মালয়েশিয়ার মাহাথিরের মত প্রযুক্তি নির্ভর করে গড়ে তুলবেন। আমরা সে চ্যাম্পিয়ন মানুষকে পেয়ে গিয়েছি। গত ৩০ বছর ধরে তিনি পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত পর্যন্ত তার সুহৃদ তৈরী করেছেন। উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম সবখানে তার গ্রহণযোগ্যতা আছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন শান্তিকামী মানুষ। তিনি একজন সাহসী মানুষ। তিনি কারো প্রতি কটাক্ষ করেন না। তিনি দেশকে অকৃত্রিমভাবে ভালবাসেন। তিনি বিশ্বাস করেন অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন হওয়া উচিত। ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার কাজের মাধ্যমে গান্ধীর মত প্রমাণ করলেন অহিংসার দিন ফুরিয়ে যায়নি। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের স্বপ্ন পূরণে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম এগিয়ে আসবে। তাদের নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে ও প্রমাণ করবে আমরা যোগ্য এবং আমরাও পারি।
আন্তরিক অভিনন্দন এ পথ প্রদর্শক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। তার সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে চাই। আর ড. মুহাম্মদ ইউনূসই বাংলাদেশের আগামী দিনের পথ প্রদর্শক।

The Aid forward ever increasing wealth concentration is dangerous because it theaters human progress, social cohesion, human resaves and democracy. A world in which wealth is concentrated in a few heads is also a world in which political power is controlled by a few and used by them for their own benefit.

কথাগুলো ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার লেখা বই A world of three zerosগ্রন্থে বলেছেন, (পাতা-২) সারা বিশে^ আজ এই বইটি বেশ আলোচিত। তিনটি শূন্য আজ বিশ্ব দিন দিন সমস্যা সঙ্কটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। উক্ত ‘থ্রি জিরো’ সমস্যার সমাধান হলে বিশ্ব সুস্থ হবে। এটি তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টা।
গ্রামীণ ব্যাংকের জনক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং Father of Microcredit তিনি বর্তমানে Father of social Business. হয়তো আবারও যদি ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পান। তা পাবেন ‘থ্রি জিরো থিওরি’ জন্য অথবা ‘সোশ্যাল বিজনেস’, নতুন এই চিন্তার জন্য। আমরা সেই দিনের অপেক্ষায় রইলাম।

লেখালেখিতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস:
ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন গবেষক, অর্থনীতিবিদ, চিন্তুক। কিন্তু সৃজনশীল লেখক নন। কিন্তু তিনি লিখেছেন অনেক। তাঁর লেখনির কয়েকটি গ্রন্থ হচ্ছে-
১. ইউনূস, মুহাম্মদ (১৯৭৪)। জোবরার তিন কৃষক।
২. মুহাম্মদ ইউনূস (১৯৭৬) কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার বিশ্বকোষ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
৩. গ্রামীণ ব্যাংক, আমার মতে (১৯৯৬)
৪. দরিদ্রের জন্য ব্যাংকার ক্ষুদ্র ঋণ এবং বিশ্ব দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (১৯৯১)
৫. দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব তৈরি : সামাজিক ব্যবসা এবং পুজিবাদের ভবিষ্যত (২০০৭)
৬. সামাজিক ব্যবসা গড়ে তোলা : মানবতার সবচেয়ে জরুরী চাহিদা পূরণকারী নতুন ধরনের পুঁজিবাদ (২০১০)

তিন শূন্যের পৃথিবী : শূন্য দরিদ্র, শূন্য বেকারত্ব এবং শূন্য কার্বন নিগমনের নতুন অর্থনীতি (২০১৭)।
সম্মাননা ও পুরস্কার
১৯৭৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় ও আন্তর্জাতিকসহ প্রায় ১৪৫টি পুরস্কার অর্জন করেন। পৃথিবীর ৭১টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন।
১৯৮৪ সালে রামোন ফ্যাগসেসে পুরস্কার ফিলিপাইন।
১৯৮৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার
১৯৯৮ সালে ইন্দিরা গান্ধী শান্তি পুরস্কার।
২০০৬ সালে টাইম ম্যাগাজিনে শীর্ষ ১২ জনের একজন।
২০০৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রেসিডেন্সিয়াল মডেল অব ফ্রিডম পান।

২০২১ সালে অলিম্পিক লরেন পুরস্কার পান।
২০২৫ সালে চীনের শিকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।
২০২৫ এর ১৪ মে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ড. ইউনূসকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করেন।

নির্বাচিত সরকারের নিকট দায়িত্ব অর্পণ :
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তিনি ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ সকল দলের অংশমূলক জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারের নিকট দায়িত্ব অর্পণ করে নিজ কর্মস্থলে ফিরে গিয়েছেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূস তারেক রহমানের নিকট দেশের দায়িত্ব হস্তান্তর করে ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে বিদায় গ্রহণ করেন।

The post ড. মুহাম্মদ ইউনূস আমাদের গর্ব appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
https://chintavabna.com/dr-muhammad-yunus-our-pride/feed/ 0
সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ – সমাজ সংস্কারক‘লালসালু’ প্রেক্ষিত https://chintavabna.com/syed-waliullah/ https://chintavabna.com/syed-waliullah/#respond Fri, 08 Sep 2023 17:27:21 +0000 https://chintavabna.com/?p=864 “আধুনিক বাঙালি মুসলমানের বাংলা সাহিত্য চর্চায় অংশ গ্রহণ সাধারণ ভাবে কম, উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে আরো কম। ফলে প্রথম যুগের বাংলা উপন্যাস বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রতিফলন…

The post সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ – সমাজ সংস্কারক<br>‘লালসালু’ প্রেক্ষিত appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
“আধুনিক বাঙালি মুসলমানের বাংলা সাহিত্য চর্চায় অংশ গ্রহণ সাধারণ ভাবে কম, উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে আরো কম। ফলে প্রথম যুগের বাংলা উপন্যাস বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রতিফলন নেই বললেই চলে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেস দিকে মীর মোশাররফ হোসেন একাত্র গদ্য লেখক যিনি উপন্যাস রচনা করেছেন। তারপরে বর্তমান শতাব্দীর প্রথম দিকে মোজাম্মেল হক, কাজী ইমদাদুল, নজিবর রহমান প্রমুখ লেখকের আবির্ভাব হয়। এদের প্রয়াসে নীতি শিক্ষামূলক কাহিনী সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক বাস্তবতা কিংবা চরিত্রের অন্তর্লোকের প্রবেশের দিকে ততো মনোযোগী এঁরা হতে পারেনি। অধিকতর সকল উপন্যাস আমরা পাই কাজী আবদুল ওদুদ, হুমায়ুন কবীর, আবুল ফজল প্রমুখের রচনায়। সাহিত্য ক্ষেত্রে এঁদের উত্তরসুর শওকত ওসমান, আবু রুশদ এবং সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। এঁরা আধুনিক চিন্তা ও মননের মানুষ সেই কারণে এঁদেরই রচনায় আধুনিকতার বৈশিষ্ট্যসমূহ যথার্থভাবে উপস্থাপিত হতে দেখা যায। সমাজকে ব্যক্তিকে এবং সেই সঙ্গে সামগ্রিক জীবনকে বিশ্লেষণ করে এঁরা উপন্যাসের শিল্পরূপের মধ্যে তা ধারণ করেছেন। বলা যায়, এই প্রজন্মের মুসলমান লেখকরাই পরিণত উপন্যাস শিল্পী হয়ে উঠতে পেরেছেন।”
কথা সাহিত্যিক শওকত আলী তাঁর এক নিবন্ধে সুন্দরভাবে বর্ণনা করেছেন। সেই মানে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ একজন আদর্শিক উপন্যাসিক, কথাশিল্পী, সৃজনশীল সুলেখক।
১৯২২ সালে ১৫ই আগস্ট সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ জন্মগ্রহণ করেন চট্টগ্রাম জেলায়। পিতা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মাতার নাম ছিল নাছিম আরা খাতুন। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন। চট্টগ্রাম জেলার ষোলশহরে তাঁদের বাস ছিল।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাবা ছিলেন ব্রিটিশ রাজ্যের সময় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। তাই কিশোর সময় বাবা মায়ের সঙ্গে ময়মনসিংহ, ফেনী, কিশোরগঞ্জ, কুড়িগ্রাম প্রভৃতি জেলায় কাটান। তিনি ১৯৩৯ সালে কুড়িগ্রাম হাইস্কুল থেকে ‘মেট্রিকুলেশন’ পাস করেন। ১৯৪৩ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে আইএ এবং কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রী পরবর্তী তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিষয়ে পড়ার জন্য এমএ ভর্তি হন। কিন্তু তিনি এমএ পড়া শেষ করতে পারেননি। এমএ পাস করার পূর্বেই কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি কলিকাতা বিখ্যাত ইংরেজী দৈনিক স্টেটসম্যান পত্রিকায় সাংবাদিকতায় চাকরি শুরু করেন। এবং ধীরে ধীরে কলিকাতা সাহিত্যমহলে পরিচিতি লাভ করতে থাকেন। তিনি স্কুল জীবন থেকে লেখালেখি করে এসেছেন। প্রবন্ধ, ফিচার লেখা তার বিজয়ে পরিণত হয়। কলিকাতা গিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন।
১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কলিকাতা থেকে ঢাকায় চলে আসেন। কিছুদিন ঢাকা বেতার কেন্দ্রের সহকারী বার্তা সম্পাদক হিসাবে কাজ করেন। ১৯৫০ সালে তিনি করাচি বেতার কেন্দ্রের বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৫১ সাল থেকে বিদেশে বৈদেশিক মন্ত্রণালয় অধীনে ঢাকা, সিডনী, করাচি, জাকার্তা, বন, ল-ন এবং প্যারিসে সরকারি চাকরি করেন। তাঁর সর্বশেষ কর্মস্থল ছিল প্যারিস।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। তিনি মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন লেখনির মাধ্যমে এবং জনমত গঠনের মাধ্যমে। তাই সরকারি চাকরি তিনি ছেড়ে দেন। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে তিনি ১৯৭১ সালের ১০ই অক্টোবর প্যারিসে পরলোকগমন করেন।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বাংলা সাহিত্যে এক বিশেষ আসন দখল করে আছেন। তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা কম হলেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বলিষ্ঠ, গঠনমূলক, রুচিশীল, সমাজ সংস্কারমূলক। বিশেষত তাঁর গল্প, উপন্যাস ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের বহির্লোকে এবং অন্তলোকের যে সুষ্ম ও গভীর রহস্য উদঘাটন করেছেন তার তুলনা বাংলা সাহিত্যে খুবই কম। কুসংস্কার ও অন্ধ ধর্মবিশ্বাসে আচ্ছন্ন, বিপর্যস্ত, আশাহীন ও মৃতপায় সমাজ জীবনের চিত্র যেমন এঁকেছেন একদিকে, তেমনি অন্যদিকে মানুষের মনের ভেতরকার লোভ, প্রতারণা, ভীতি ঈর্ষা প্রভৃতি প্রবৃত্তিগুলোর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিজ্ঞানীর মতোই উদঘাটিত করেছেন তিনি। সাদা মাটা গল্প, উপন্যাস রচনা সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ কলমে আসেনি। তিনি মানব জীবনের মৌলিক সমস্যা সমূহকে পাঠকের সামনে অতি যত্ন সহকারে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।
স্কুল জীবন থেকে তিনি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। ছাত্রজীবনে থেকে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তার গল্প ও কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। ১৯৪৬ সারে তার প্রথম গল্প গ্রন্থ ‘নয়নতারা’ কলিকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘দুইতীর’ ১৯৬৫ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘লালসালু’ রচনা করেন ১৯৪৭ এবং ১৯৪৮ সালে। তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস চাঁদের অমাবস্যা ১৯৬৪ সালে এবং তৃতীয় উপন্যাস ‘কাদো নদী কাঁদো’ ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় ঢাকা থেকে। তিনি উপন্যাসও ছোট গল্পের সঙ্গে সঙ্গে নাটকে ও গুণী ছিলেন। ‘বহিপীর (১৯৫৫) তরঙ্গ তঙ্গ (১৯৬৪), ‘সুড়ঙ্গ (১৯৬৪) তিনটি বিখ্যাত নাটক প্রকাশিত ও মঞ্চস্থ হয়।
ছোট গল্প লেখক হিসাবে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ বেশ পাকা ছিল। তাঁর বিখ্যাত ছোট গল্প এই নয়ন তারা (১৯৪৫), বৃটিশ ভারত আমলে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৬৭ সালে দ্বিতীয় গল্প এই দুই তীর ও অন্যান্য গল্প ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর ‘লাল সালু’ উপন্যাসটি বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। সারা জীবন বিদেশে, উন্নত দেশে বসবাস ও জীবন কাটানোর পরও তিনি গ্রামীণ মানুষের জীবন, কর্ম ও নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে ‘লালসালু’ উপন্যাস লিখেন। এই উপন্যাসটি তাঁর ফরাসী স্ত্রী অহহব সধৎরপ ইংরেজীতে ও ফরাসী ভাষায় অনুবাদ করেন।
১৯৫৫ সালে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ অস্ট্রেলিয়া সরকারি চাকরি করা কালীন সিডনীতে ফ্রান্সের এই মহিলা অহহব গধৎরব কে বিবাহ করেন। তাদের ঝরসরহব এবং ওৎধল নামে দুই সন্তান।
২০০১ সালে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ লেখা লাল সালু উপন্যাসটিকে চলচ্চিত্রে রূপদান করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্রকারক তানভীর মোকাম্মেল। সুধীমহলে, সাধারণ মহলে লালসালু সিনেমা চমৎকার আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এইসব সাহিত্যকর্মের জন্য সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ স্বদেশের মানুষের নিকট যেমন সম্মানিত ছিলেন, তেমনি বিদেশী সাহিত্য অঙ্গনে তিনি ছিলেন আলোচনার বস্তু। বিশেষ করে লালসালু তাকে ইংরেজী ও ফরাসি সাহিত্যানুরাগীদের নিকট সুপরিচিত করে তুলেছে।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। আধুনিক ও নাগরিক রুচি ও মননের অধিকারী লেখক অনেক সময় কলিকাতা ইংরেজী দৈনিক স্টেটসম্যান পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন, তখন বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবার জীবন নানা ঘাত প্রতিঘাতে অস্থির ও চঞ্চল। স্বাধীনতা ও পাকিস্তান আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশ বিভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা আবার একই সঙ্গে নতুন রাষ্ট্রগঠনের উদ্দীপনা সব মিলিয়ে মধ্যবিত্তের জীবনে এক দুরন্ত ক্রান্তিকাল চলেছিল।
ঐ সময় একজন নবীন লেখকের পক্ষে তাঁর চারিদিকের পরিচিত জীবন ও মানুষ নিয়ে গল্প, উপন্যাস লেখা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু তিনি সেই পথে গেলেন না। তিনি পদাপণ করলে ভিন্ন এক মাত্রা। তিনি ‘লালসালু’ মত উপন্যাসের পটভূমি ও মানুষের সমাজ বেচে নিয়ে গ্রাম বাংলার প্রকৃত চিত্র উপন্যাসে চিত্রায়িত করলেন।
গ্রাম প্রধান আমাদের বৃহত্তর দেশ ও সমাজ। বেশির ভাগ মানুষই গ্রামে থাকে সেখানেই তাদের বাঁচা মরা এবং জীবনযাপন। সেই সমাজে এমন এক রীতি নীতি ও ধারণা বিশ্বাস জন্ম লাভ করে লালিত হয়ে চালু থাকে যা শহরবাসী শিক্ষিত লোকের অভিজ্ঞতার বাইরে। অথচ সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ তাঁর প্রথম উপন্যাসের পটভুমি প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল এবং তার সমাজ-চরিত্র, এক দিকে কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্মভীরু শোষিত দরিদ্র গ্রামবাসী, অন্যদিকে শঠ, প্রতারক, ধর্ম ব্যবসায়ী এবং শোষক ও ভূ-স্বামী। আর তার উপন্যাসের বিষয় যুগ যুগ ব্যাপী শিকড় গড়া কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ও ভীতির সঙ্গে সুস্থ জীবনকাক্সক্ষার দ্বন্দ্ব।
সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ একজন মানবতাবাদী লেখক। মানুষের যুক্তি এবং বিকাশ এই ইচ্ছা যে তাঁর সাহিত্য রচনার মুল বিষয় ছিল তাতে কোন সন্দেহ নাই। আমাদের দেশের সামাজিক বাস্তবতায় বা মানুষের বিকাশের পথে অন্তরায় সেও লোকে তিনি চিহ্নিত করেছেন, দেখিয়েছেন কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের এক প্রচন্ড দাপট। সরল ও ধর্মপ্রাণ মানুষকে কিভাবে বিভ্রান্ত ভীত করে শোষণের প্রক্রিয়া চালু রাখা হয় তারই বর্ণনা তিনি তার উপন্যাসে দিয়েছেন।
আমাদের চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ উপজেলায় জন্ম নেয়া আর এক কৃতি সন্তান, বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক, মোহাম্মদ ওয়ালিউল্লাহ (১৯০৭-১৯৭৮), যিনি নিজ জন্মভুমি লোকের কাছে এবং বন্ধু বান্ধব মহলে এক কালে ‘ওয়ালি গান্ধী’ নামে পরিচিত ছিলেন। আজকের প্রবন্ধে তিনি হচ্ছেন সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ। তিনিও চট্টগ্রাম জেলার ষোলশহরে জন্ম নিয়ে বাংলা সাহিত্য জগতে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন।
‘ওয়ালি গান্ধী’ যেমন আমাদের মুক্তি সংগ্রাম (১৯৫৩), যুগম বিচিত্রা (১৯৬৭), সেকালের কাহিনী (১৯৫০), প্রভৃতি গ্রন্থ লিখে অমর হয়ে আছেন। ওয়ালি গান্ধী ১৯৬৭ সালে যুগ বিচিত্রা গ্রন্থ লিখে দাউদ পুরস্কারও লাভ করেন।
তাই অনেক সময় দুই লেখকের একই ধরনের নাম হওয়ার কারণে আমরা পাঠক অনেক সময় পরিচয় সমস্যায় পড়ে যাই। কিন্তু সাহিত্যকর্মে দু’জনই আমাদের অতি প্রিয়।
বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সমাদৃত হয়েছেন। তিনি তার সাহিত্যকর্মের জন্য ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত হন। ১৯৬৪ সালে তার সৃজনশীল লেখনীর জন্য বিখ্যাত আদমজী পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৪ সালে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ একুশে পদক লাভের মাধ্যমে তাঁর সাহিত্য কর্মের স্বীকৃত অর্জন করেন। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘লাল সালু’ চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কারে ভুষিত করা হয় ২০০১ সালে।
‘লাল সালু’ উপন্যাসটি ইংরেজী ভাষায় অনুবাদ করা হয়, যার নাম ছিল ঞৎবব রিঃযড়ঁঃ জড়ড়ষং.”
যার অবিস্মরণীয় লেখা ‘লালসালু’ লিখে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ সর্বমহলে সুপরিচিতি লাভ করেন। আমাদের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠ্যসূচীতে ‘লালসালু’ স্থান করে নিয়ে তাঁকে গণমানুষের উপন্যাসিক তথা সাহিত্যিকের হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করার অপার সুযোগ করে দিয়েছে।
‘লালসালু’ উপন্যাস সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বিশিষ্ট কথা সাহিত্যক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শওকত আলী বলেন,
‘লাল সালু’ সৈয়দ ওয়ালি উল্লাহর প্রথম উপন্যাস, যে একটি দুঃসাহসী প্রয়াস। জীবন বাস্তবতা যেমন তেমনি সামাজিক বাস্তবতা ও এর ভিত্তি। গ্রামীণ জনজীবনকে এবং তার মানসিক, চিন্তা ভাবনা, সুখ দুঃখ ও বিশ্বাস সংস্কারগুলোকে উপাদান হিসাবে ব্যবহার করে এই উপন্যাস রচিত হয়েছে এবং উপন্যাসের শিল্প রূপটি যাতে সুসামঞ্জস্য হয় সেদিকে লেখক দৃষ্টি রেখেছিলেন। এর ভাষা সহজ কিন্তু ব্যঞ্চনাময়। আঞ্চলিক শব্দ নিরাক বতোর, মগরা ইত্যাদি যেমন ব্যবহার করেছেন, তেমনি পাশাপাশি ও কাছাকাছি তৎসম, অর্ধতৎসম, আধুনিক শব্দ সুন্দর ও মানানসইভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতীক ও উপমা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও লেখকের মাত্রাবোধ লক্ষ্য করার মতো। কোন প্রকার নাগরিক প্রসঙ্গ সবই তুলে এনেছেন তিনি গ্রামীণ পটভূমি থেকে। উপন্যাসের যে কাহিনী গত কাঠামো, সেটিও লক্ষ্য করার মতো। তাহেরের বাপের বিচার, আওয়ালপুরের পীর সাহেবের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আক্কাস আলীর স্কুল প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা এসব ঘটনা বাহিরের, সামাজিক এবং পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতার ফাঁক পূরণ করা হয়েছে মজিদের পারিবারিক ঘটা ও চিন্তা ভাবনার কথা সাজিয়ে। ঘটনাবলী বাহিরের দিক থেকে সম্পর্কবিহীন থাকা সত্ত্বেও ‘লালসালু’ যে একটি সুসংহত শিল্পরূপ তার কারণ লেখকের শিল্পী মনের সজাগ অভিনিবেশ। একজন লেখকের প্রথম উপন্যাসে এ ধরনের শিল্প ও আঙ্গিকগত রাঁধুনি বিস্ময়ের উদ্রেক করে। এই কারণেই ‘লালসালু’ উপন্যাসখানি, লেখকের প্রথম রচনা হলেও বাংলা সাহিত্যের বিশাল ও বিস্তৃত ভুমিতে বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

Image source : https://www.syedwaliullah.com

The post সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ – সমাজ সংস্কারক<br>‘লালসালু’ প্রেক্ষিত appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
https://chintavabna.com/syed-waliullah/feed/ 0
সৈয়দ আলী আশরাফঃ বহুমাত্রিক গুণে মর্যাদাবান একজন কবি ও গদ্যশিল্পী https://chintavabna.com/syed-ali-ashraf/ https://chintavabna.com/syed-ali-ashraf/#respond Tue, 10 Aug 2021 14:58:32 +0000 https://chintavabna.com/?p=595 “সাহিত্য বলতে আমরা গল্প, উপন্যাস, কবিতা এবং নাটককে বুঝি। এই চার শ্রেণীর লেখা মূলত কাল্পনিক। অর্থাৎ সাহিত্যের ভিতরে ঐতিহাসিক তথ্যের সন্ধান করা ভুল। সাহিত্যিক জীবন…

The post সৈয়দ আলী আশরাফঃ বহুমাত্রিক গুণে মর্যাদাবান একজন কবি ও গদ্যশিল্পী appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
“সাহিত্য বলতে আমরা গল্প, উপন্যাস, কবিতা এবং নাটককে বুঝি। এই চার শ্রেণীর লেখা মূলত কাল্পনিক। অর্থাৎ সাহিত্যের ভিতরে ঐতিহাসিক তথ্যের সন্ধান করা ভুল। সাহিত্যিক জীবন সম্বন্ধে যে সত্য উপলব্ধি করেন তাকে রূপায়িত করার জন্য কল্পনার সাহায্য নেন। তিনি অনুভ‚তি জাগ্রত করার মাধ্যমে তার উপলব্ধিলব্ধ সত্যকে পাঠকের মনে নতুন করে দোলা দিতে চান। তনি যে মানব সমাজকে জানেন এবং যে প্রকৃতির সঙ্গে তিনি পরিচিত তার থেকে চিত্রকল্প আহরণ করে নতুন রূপকল্পের সৃষ্টি করেন।”


“সাহিত্য ও মূল্যবোধ” শিরোনামে প্রবন্ধের শুরুতে অধ্যাপক কবি সৈয়দ আলী আশরাফ উপরে উল্লিখিত কথাগুলো বলে মূল প্রবন্ধের আলোচনা শুরু করেছেন। তিনি উক্ত প্রবন্ধে আরও বলেনঃ
“সেই জন্য বলতে পারি সাহিত্য জ্ঞানের একটি শাখা। ধর্ম আমাদের শিক্ষা দেয় যে, সত্যিকারের জ্ঞান মানুষ আল্লাহর তরফ থেকে পায়। তাকেই অহীলব্ধ জ্ঞান বলে। ইসলামে বলা হয় যে, এই জ্ঞানের চরম এবং সম্পূর্ণ রূপ মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা:) এর মাধ্যমে কোরআন হিসেবে আল্লাহ দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। অন্য সমস্ত জ্ঞানই মানুষের সচেষ্ট প্রয়াসের মাধ্যমে অর্জিত হয়।”


সৈয়দ আলী আশরাফ বহুমাত্রিক গুণে মর্যাদাবান একজন কবি ও গদ্যশিল্পী। তার কবিতা, কাব্য বিবেচনা, চিন্তার মৌলিকতা বাংলা ভাষার গৌরবীয় সম্পদ।
অধ্যাপক ড. সৈয়দ আলী আশরাফ The islamic Academy, Cambridge এর মহা পরিচালক এবং বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা ও উপাচার্য ছিলেন। তিনি ১৯২৫ সালে ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের বর্তমান রাজধানী ঢাকায় জন্ম গ্রহণ করেন। আর ১৯৯৮ সালে ৭ আগস্ট, শুক্রবার সকালে কেমব্রিজে নিজ বাসভবনে তিনি ইন্তেকাল করেন।


ঢাকা শহরে তার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা জীবন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শেষ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হন। তিনি ফিটজউইলিয়াম কলেজ (Fitzwilliom, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান) থেকে অনার্স এবং পিএচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৪৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজী সাহিত্য বিভাগের প্রভাষক (Lecturer) হিসেবে অধ্যাপনা শুরু করেন, ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজী সাহিত্য বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি বিদেশে OIC বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করেন।


অধ্যাপক সৈয়দআলী আশরাফ তার ব্যক্তি জীবন ও আদর্শ বোধ উভয় ক্ষেত্রেই ইসলামী চেতনাকে গভীরভাবে অনুধাবন করেছিলেন এবং আমৃত্যু সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে গিয়েছেন। বৈশ্বিক ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্জাগরণে তার অসামান্য মৌলিক অবদান পুরো পৃথিবী ব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থা ইসলামি করণ আন্দোলনে ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তা পরবর্তীতে ইসলামি শিক্ষা দর্শণের বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় বৈশ্বিক প্রভাব ফেলেছিল।


অধ্যাপক সৈয়দ আলী আশরাফ একজন সাহিত্য সমালোচক এবং কবি ও ছিলেন, তিনি বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় লিখতেন। কবি সৈয়দ আলী আশরাফ সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবু রুশদ বলেন:
“সৈয়দ আলী আশরাফ এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ইংরেজি সাহিত্যের কৃতি ছাত্র ও শিক্ষক, দেশি বিদেশি সাহিত্য তার স্বচ্ছন্দ পদচারণা, ব্যক্তিগত প্রেসের অভিজ্ঞতা থেকেও তিনি গচ্ছিত নন, তিনি জীবনের অসংশোধনীয় অযৌক্তিকতা ও ক্ষণভঙ্গুরতার মধ্য দিয়ে এক দুর্লভ অভিজ্ঞতার দ্ব›দ্ব বিক্ষুব্ধ সন্ধানী এবং সর্বশেষে তিনি কিছুটা মরমী ধরনের আধ্যাত্মবাদের ও নিজের ধর্মের নিগূঢ় আশ্রয়সন্ধানী। তাই তার কবিতায় দেখতে চাই:- তার বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ ‘রূবাইয়াতে জহীনি’ লিখেন:
“আকাশের আলো অনাবিল জানি, সন্দী এই বসুন্ধরা,
এই তনু মন অযাচিত দান, এই কুহু স্বর মধুক্ষরা,
তবু দিল তুমি সাহারা করেছ- ধূ ধূ করে বালু তৃপ্তিহীন
এ কি তোমার রাজ্জাকী খোদা?সাখাওয়াতী কই তৃষ্ণাহরা?


সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ১৯৯১ সালে ড. রাজিয়া সুলতানা বলেন:
“বাংলা সাহিত্যে দার্শনিক কবিতার জগতে সৈয়দ আলী আশরাফ একটি অসাধারণ নাম। তার কবি ব্যক্তিত্ব কোন বিশেষণে সীমায়িত হবার নয়। তিনিই প্রথম কবি, যাকে কবিতার বক্তব্য এবং আঙ্গিকের মধ্যদিয়ে যুগান্তর প্রতিভা বলে চেনা যায়। তার বক্তব্যে যে স্বকীয়তা ও শৈলী রয়েছে তাতে তিনি বাংলাদেশের বিশিষ্ট স্বাতন্ত্র চিহ্নিত জাতীয় সঙ্কট ত্রাণের প্রতিভ‚ বলে পাঠ-পাঠিকার হৃদয়ে বৃত্ত হবার স্পর্ধা রাখেন।”


সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতায় প্রেম, ভালবাসা, দুনিয়া, মানুষ একাকার হয়ে আছে। তার লেখনিতে প্রেমের যে ঝংকার তা আমাদের সব সময় পুলকিত করে। কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে-
“যে প্রেম বায়ুর বেগে ভুলে যায় পথের ঠিকানা,
পালকের মত ক্ষীণ, ভ্রষ্টনীড়, অধীর, চপল,
সেই প্রেম প্রেম নয়- মোহমত্ত দেহের কামনা,
যৌবনের তারে তারে মিহিসুর ক্ষণিত সম্বল।
সেই প্রেম দৃঢ়মূল, ঝড়ে তবু নতশির যার,
শাখায় শাখায় শুধু হাহাকার আকুলি জাগায়,
সে প্রেম সীমায় বন্দী বসন্তের অনন্ত বাহার,
তবু সে গোস্পদে বৃথা আকাশের অসীমতা চায়।
খাঁটি প্রেম মাটি যেন, সহ্য তার কঠিন পীড়ন,
তবু সে সপ্তর্ষি, নিত্য ধ্রæবতারা প্রদক্ষিণ করে,
পর্বতের মত তার ইমানের অনড় গড়ন,
অবিচল আকাশের অবিকল প্রতিকায়া ধরে।
এই প্রেম অন্ধরাত্রে নুরানীর অনির্বাণ শিখা
রূহের আকাশ পথে যোগ করে দেহের মৃত্তিকা।”


১৯৯৭ সালে কবি সৈয়দ আলী আশরাফ স্মরণে কবি ইশারফ হোসেন এর সম্পাদনা একটি পত্রিকা সকাল প্রকাশিত হয়। উক্ত পত্রিকা উত্তর আধুনিক সাহিত্য আন্দোলনের মূখপাত্র হিসাবে তখন বেশ জনপ্রিয় ছিল। ঐ সংখ্যায় ইশারফ হোসেন সৈয়দ আলী আশরাফ এর এক দীর্ঘ সাক্ষাতকার গ্রহণ করে প্রকাশ করেন। তাতে কবি এক প্রশ্নে কবিতা সম্পর্কে বলেন,
সাম্প্রতিক বলতে যদি গত ত্রিশ বছরের কথা বলো তাহলে দুটো ধারা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। একটি হচ্ছে বিশ্বাসহীন, ধর্মহীন। সুতরাং নিজস্ব কষ্টির মূল মানদন্ড সম্বন্ধে আস্থাহীন নতুন মানবতা সন্ধানী এক ধরনের কবিতা আর দ্বিতীয়টি ধর্মের মূলগত যে আধ্যাত্মিক সেই উপলব্ধিভিত্তিক মানবতার চিরন্তন মানদন্ডকে নতুনভাবে সাহিত্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা। অমিয় চক্রবর্তী যেমন অত্যাধুনিক হয়েও বিশ্বাস সচেতন আমিও তেমনি আধুনিক বিভ্রম এবং বিভ্রান্তিক জানার জন্যই ধর্মের আধ্যাত্মিক উপলব্ধিকে একান্তভাবে প্রয়োজনীয় মনে করি। আমার কবিতায় তুমি তারই স্বাক্ষর দেখতে পাবে।”
সৈয়দ আলী আশরাফ তার সেই চিন্তা যেমন চরিত্র, কাব্যে, গদ্যে, প্রকাশ করেছেন তার নতুনা নাচের কবিতাংশে দেখি:
“এ জীবনে বন্দী হয়ে থেকে
রূহানীর নূরানীকে ভুলে,
রূহানীর দীপ্তি চোখে এলে
এ জীবন দেখেছি নূরানী।
রূহানী অজ্ঞ দীপ্তি প্রেমিতে ভাস্বর
সেই প্রেম দীপ্ত চোখে মৃত্যুই নশ্বর।
পেরিয়ে সমুদ্র মরুবালুর পাহাড়
পূত মদিনায় তাই এসেছি এবার।”


সৈয়দ আলী আশরাফ শুধু কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, ভ্রমণ বিষয় লেখেননি, লিখেছে অগণিত ইংরেজী প্রবন্ধ। যা দেশে বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হচ্ছে; কবিতা: চৈত্র যখন (১৯৫৭), বিসংগতি (১৯৭৪), হিজরত (১৯৮৪), রূবাইয়াতে জহীনি (১৯৯১), অনুবাদ: ইভানকে ক্লেয়ারগল (১৯৬০), প্রবন্ধ: কাব্যপরিচয় (১৯৫৭), নজরুল জীবনে প্রেমের এক অধ্যায় (১৯৯৫), বাংলা সাহিত্যে মুসলিম ঐতিহ্য, অন্বেষা। ইংরেজীতে: Ed. The other Harmony,Muslim Tradition in Bengali Literature (1982), Literature, Society and Culture 1947-1972, Muslim Education: Aims and Objectives of Islamic Education: Curriculum and teacher Education-etc.
সৈয়দ আলী আশরাফ একজন সার্থক সাহিত্য সমালোচক ছিলেন। বিভিন্ন কবি, সাহিত্যিকে নিয়ে তার বহু প্রবন্ধ নিবন্ধ রয়েছে। স্বার্থক সমালোচক হিসাবে তিনি বাংলা সাহিত্যে বড় আসন লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন। ‘আধুনিক বাংলা কাব্যে সমাজ সচেতনতা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে সৈয়দ আলী আশরাফ বলেন:
একজন তরুণ লেখক স্বীকার করেছেন রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দু’ বলেই নিজেকে পরিচয় দিতেন এবং হিন্দু ঐহিত্যের ভিতরেই বহুকিছুর সন্ধ্যান পেয়েছেনÑহিন্দু এবং মুসলিম ঐতিহ্যকে মিল করার ব্যর্থ প্রয়াস করেননি। নজরুল সেই চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সার্থক হননি। অপূর্ব সুন্দর ভাষায় তিনি কালী বন্দনা ও রচনা করেছেন আবার রসূল সাল্লাল্লাহ আলাইহে ওয়া সাল্লামের উপর অপরূপ কবিতা এবং ‘নাত’ লিখেছেন। কিন্তু এ দুই দুই-ই থেকেছে। এ দুইকে এক করতে পেরেছেন (এবং সে ব্যাপারে তার সার্থকতা প্রশংসনীয়) যখন তিনি তার নিজস্ব জীবনবোধ বা বিদ্রোহ বা প্রেমকে রূপায়িত করতে চেয়েছেন। ‘খোদার আসন আরশ’ এবং ‘পরশুরামের পরশ কুঠার’ একই কবিতায় স্থান পেয়েছে। এ কবিতায় তিনি হিন্দু বা মুসলিম জীবনবোধ ফুটিয়ে তুলতে চাননি, তার প্রেমের অভাবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকে পরিস্ফুট করতে চেয়েছেন। কিন্তু যখনই তিনি এমন কোন ভাষা ব্যবহার করেছেন যে ভাষা হিন্দু ঐতিহ্যকে জাগ্রত করে এবং মুসলিম ভাবধারার বিরোধী সেখানে হিন্দু মুসলিম ভাবধারা মিলাতে তিনি সার্থক হননি।


‘সৈয়দ আলী আশরাফের কবিতা ও কবি মানস’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে বিশিষ্ট সাহিত্যিক, গবেষক মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ বলেন:
“কাব্যের ভাব বা বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে সৈয়দ আলী আশরাফের রচনায় বৈচিত্র্য ও ব্যাপ্তি তার পরিচয় দিতে গেলে উল্লেখ করতে হয় যে, প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশের পটভূমি ও পরিবেশ, ব্যক্তিগত সুখ-দু:খ অনুভ‚তি, আত্ম-অন্বেষণ ও আবিষ্কার, মানবিক মূল্যবোধ, অবক্ষয়ের বেদনা, বিষাদ ও বিসঙ্গতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য চেতনা, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বোধ এবং চিন্তা-চেতনা, সংস্কৃতিক ধ্যান-ধারণা, মনন-চিন্তন, প্রজ্ঞা ও আধুনিক জীবনবোধ তার কবিতায় ব্যঙ্গময়।”

তিনি সৈয়দ আলী আশরাফ সম্পর্কে একই প্রবন্ধে আরও বলেন:
“বস্তুত: ঐতিহ্যবোধ ও প্রেরণাগত দিক ছাড়া, নজরুলের সঙ্গে সৈয়দ আলী আশরাফের কাব্যগত সম্পর্ক অত্যন্ত ক্ষীণ এবং কিছু আরবী ফারসী শব্দ ব্যবহারের মধ্যেই একরূপ সীমাবদ্ধ। বরং ফররুখ আহমদের সঙ্গেই তার মানস সার্যজ্য বেশী। যদিও তিনি ফররুখ আহমদের মতো বলিষ্ঠ ও সোচ্চার কন্ঠ নন, হয়তো বা কাব্যে তেমন মিশনারীও নন।”

মূলত সৈয়দ আলী আশরাফ একজন ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও সৃষ্টিশীল মানুষ ছিলেন। জীবন ও চরিত্রে ইসলামের মৌলিক বিষয় সমূহকে ধারণ করে জীবন কাটিয়েছেন। তিনি একজন স্বার্থক সুফী। সুফী জীবনের মৌলিক চরিত্র সমূহ তার জীবন চরিত্রে সুন্দরভাবে চর্চা করার চেষ্টা করেছেন। ইসলামী শিক্ষা তথা শিক্ষাকে কিভাবে ইসলামের আদলে ঢেলে সাজানো যায় তার জন্য তিনি দীর্ঘ জীবন সাধনা করেছেন, গবেষণা করেছেন, লিখেছেন এবং বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টাও করেছেন। বাংলাদেশে ইসলামী আন্দলনের শিক্ষাকে বাস্তবরূপ দেয়ার জন্য তিনি ঢাকায় দারুল এহেসান বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন।


অধ্যাপক ড. আলী আশরাফ ছিলেন বুদ্ধি বৃত্তিক চিন্তাশীল এবং অধ্যাত্মিক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন অক্লান্ত পরিশ্রমী একজন মানুষ। এরপরও সাদা মাটা জীবন ছিল তার পছন্দ। তিনি ছিলেন প্রকৃত বিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক; যে বিশ্বাস জ্ঞান ও ভালবাসায় লালিত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুহৃদয়বান ও স্নেহময়। তিনি দয়া ও সহমর্মিতায় ছিলেন সিক্ত, সব সময় সাধ্যমত অন্যকে সহযোগীতা করতেন। তিনি ছিলেন একজন মহান শিক্ষক, একজন ভাল বন্ধু এবং একজন বিচক্ষণ পরামর্শ দাতা, একজন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে ইসলামের বাণী প্রচারে দেশে দেশান্তরে জীবন কাটিয়েছেন।
সৈয়দ আলী আশরাফ সম্পর্কে খুবই সংক্ষেপে মাহমুদ শাহ কোরেশী বলেন “সমগ্র বিশ্বে ইসলামি শিক্ষা পদ্ধতির অনন্য বৈশিষ্ট্যগুলো উপলব্ধি করানোর কাজটি ছিল তার জীবন সাধনা। অথচ তিনি ছিলেন আধুনিক ইংরেজী কবিতার অন্যতম রসগ্রাহী সমালোচক ও সাহিত্যের সমাজতত্ত¡ বিষয়ে একজন প্রাথমিক গবেষক।”

The post সৈয়দ আলী আশরাফঃ বহুমাত্রিক গুণে মর্যাদাবান একজন কবি ও গদ্যশিল্পী appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
https://chintavabna.com/syed-ali-ashraf/feed/ 0
শাহ আবদুল হান্নান : আমাদের পথচলার আদর্শ https://chintavabna.com/shah-abdul-hannan/ https://chintavabna.com/shah-abdul-hannan/#respond Thu, 29 Jul 2021 15:51:51 +0000 https://chintavabna.com/?p=577 আর্থিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার যে নজির শাহ আবদুল হান্নান রেখে গেছেন, তা বিরল। তিনি ছিলেন শুল্ক ও আবগারি বিভাগের কালেকটর, দুর্নীতি দমনব্যুরোর মহাপরিচালক, জাতীয়…

The post শাহ আবদুল হান্নান : আমাদের পথচলার আদর্শ appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
আর্থিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার যে নজির শাহ আবদুল হান্নান রেখে গেছেন, তা বিরল। তিনি ছিলেন শুল্ক ও আবগারি বিভাগের কালেকটর, দুর্নীতি দমনব্যুরোর মহাপরিচালক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য এবং চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্ণর, অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও ব্যাংকিং বিভাগের সচিব।


শাহ আবদুল হান্নান ছিলেন একজন ইসলামি দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, লেখক, অর্থনীতিবিদ ও সমাজসেবক। এছাড়াও তিনি দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ছিলেন। তিনি ইসলামি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সাবেক চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন।


শাহ আবদুল হান্নানের জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৩৯ সাল কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ জেলায়। মৃত্যু ২ জুন ২০২১ সাল। তিনি ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক এবং ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।


তার কর্মজীবন শুরু হয় শিক্ষকতা পেশা দিয়ে। ১৯৬২ সালে তিনি ঢাকা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।


শাহ আবদুল হান্নান ছিলেন একজন লেখক, গবেষক, সমাজ সংস্কারক। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন ইসলাম কিছু ধর্মীয় রীতিনীতির সমষ্টি নয়, বরং এর রয়েছে নিজস্ব পারিবারিক নীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় নীতি যা এই যুদ্ধবিধস্ত, অশান্ত পৃথিবীতে আবারো শান্তির বারতা আনতে সক্ষম। তাই তিনি তার এই চিন্তাধারাকে যথাসাধ্য মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে আমৃত্যু চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন।

তার ক্ষুরদার লেখনি অথচ সংক্ষিপ্ত, সব সময় আমাকে আকর্ষণ করেছে। যখন পত্র-পত্রিকায় তার লেখা চোখে পড়তো, তা নিমেষে পড়ে শেষ করতাম। তার জীবনের শেষের দিকে অতি সংক্ষিপ্ত, উপদেশমূলক, শিক্ষণীয়, পালনীয় লেখাটি আমার হৃদয়কে দারুণভাবে আলোড়িত করে। তিনি ‘আমার জীবনের উপলব্ধি’ শীর্ষক শিরোনামে লিখেছেন-


“আমি ৮০ বছর বয়স পার করছি। এই দীর্ঘ জীবনে নিজের অনেক অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি হয়েছে। যেসব উপলব্ধি থেকে কিছু একটা পাঠকদেরকে অবহিত করছি; যাতে তারা চিন্তার খোরাক পেতে পারেন। সব সময় আমি সংযত চিন্তা করেছি। গভীরভাবে ভেবেছি।

কারণ সেই হিসেবে আমার উপলব্ধি হয়েছে যা পাঠকদের জন্য উপকারী হতে পারে। একে একে আমার পনেরোটি উপলব্ধি নিম্নে উপস্থাপন করছি।


১. কাউকে যোগ্য হতে হলে তার উচিত গুরুত্বপূর্ণ অনেক বই পড়া। এসব বই হতে পারে ইসলামের ওপর বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ের ওপর। গণ্যমান্য লেখকের বই বাছাই করা উচিত। কারণ সব লেখকের উপলব্ধি সমান হয় না। যারা সিনিয়র লেখক, তারা অনেক চিন্তা করে লিখে থাকেন।


২. ইসলামের জন্য কাজ করতে হলে পবিত্র কুরাআনের অর্থ প্রতি বছর অন্তত একবার পড়া উচিত। কুরআনের সাথে গভীর সংযোগ ছাড়া ইসলামের মহৎ কর্মী হওয়া সম্ভব নয়। কুরআন শরীফ অসাধারণ গ্রন্থ। এতে রয়েছে আল্লাহতায়ালা সম্পর্কে বা তওহিদ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা, নৈতিকতা সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা, শিরকের বিরুদ্ধে যুক্তি এবং অনৈতিকতার বিরুদ্ধে বড় শাস্তির ঘোষণা।


৩. ইসলামের জন্য যোগ্য লোক তৈরি করা জরুরি। এজন্য সিনিয়র লোকদের উচিত ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে ক্লাস করা। একেকটি ক্লাসে ১৫-২০ জন থাকতে পারে। এই কোর্স এক বা দুই বছরের জন্য হতে পারে। নিজে এ রকম ১০টি কোর্স করেছি। এসব কোর্স কুরআনভিত্তিক ও উন্নত ইসলামি সাহিত্যভিত্তিক হতে পারে।


৪. নারীদের সব সময় খুব গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছাড়া ইসলামের বা দেশের সত্যিকার কল্যাণ হতে পারে না। তাদের মর্যাদা ও অধিকার সুনিশ্চিত করতে হবে।


৫. বর্তমানে যেসব ইসলামি সংগঠন রয়েছে সেগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সংগঠন ছাড়া বড় কাজ করা যায় না। প্রত্যেকের উচিত তার পছন্দের ইসলামি সংগঠনে যোগদান করা।


৬. অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি বইগুলো বেশি করে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার। ইসলামি দাওয়াতের অগ্রগতি নির্ভর করে মানুষকে ইসলামি বই দেওয়ার ওপর। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি বই ভালো করে ছড়ানো হয়নি। এসব গুরুত্বপূর্ণ বই ছড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।


৭. সমাজসেবার মাধ্যমে প্রত্যেকের উচিত নিজের গ্রাম বা এলাকার দারিদ্র্য দূর করা। সব কিছুই সরকার করতে পারে না। সেজন্য ব্যক্তি উদ্যোগের প্রয়োজন অনেক।


৮. মধ্যপন্থাই উত্তম। আল্লাহতায়ালা কুরআনের মধ্যপন্থার কথা বলেছেন। মুসলিম জাতিকে তিনি ‘মধ্যপন্থী’ উম্মত বলেছেন।


৯. হটকারিতা বা বাড়াবাড়ি ভালো নয়। কুরআনের বিভিন্ন জায়গাতে বাড়াবাড়ির নিন্দা করা হয়েছে। সূরা নাহলের ৯০ আয়াতে আল্লাহতায়ালা বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন।


১০. শ্রমিকরা আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বঞ্চিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা উপযুক্ত মজুরি পান না। বাধ্য হয়ে তাদেরকে অনেক আন্দোলন করতে হয়। অথচ শ্রমিকদের সমস্যা বোঝা আমাদের সবারই দায়িত্ব।


১১. গৃহকর্মী/গৃহে যারা কাজ করে, তাদেরকে খুবই কম মজুরি দেওয়া হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদেরকে দুই থেকে তিন হাজার করে টাকা দেওয়া হচ্ছে। অথচ এই মজুরি যা দেওয়া উচিত তার অর্ধেকও নয়।


১২. যারা অফিসে কাজ করেন তাদের উচিত সব সাক্ষাৎপ্রার্থীকে সাক্ষাতের সুযোগ দেওয়া। এর ফল খুব ভালো হয়। এমনকি সুবিচার করতেও এটা সহায়ক হয়ে থাকে।


১৩. অফিসের কাজ ফেলে রাখা উচিত নয়। কাজ ফেলে রাখলে পরে তা জটিলতা সৃষ্টি করে।


১৪. বিদেশ সফরে গেলে সে দেশের স্থানীয় মসজিদ ও স্থানীয় ইসলামি সংগঠনের অফিস পরিদর্শন করে আসা উচিত। এতে উম্মাহর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়।


১৫. বিদেশ সফরে গেলে কিছু ইসলামি বই সাথে নিয়ে গেলে ভালো হয়। এতে বিদেশে ইসলামের দাওয়াত দিতে অনেক সুবিধা।


১৬. বিশে^র বড় শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সুবিচারের নীতি অনুসরণ করে না। তারা নিজেদের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী স্বার্থে কাজ করে। অনেক সময় শোষণ করে।


১৭. সবর (ধৈর্য) মহা ওষুধ। সবর সব সময় সব অবস্থায় মানুষকে সাহায্য করে।


১৮. যে রাগারাগি করে, তার ভুল করার সম্ভাবনা বেশি।


১৯. সাধ্যমতো দান করা উচিত। দান করলে কেবল অন্যের নয়, নিজেরও কল্যাণ হয়।


২০. মানব জাতির সংশোধনের জন্য সাধ্যমতো ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ করা উচিত।
আমি নিজের উপলব্ধিগুলো বললাম। যদি এগুলো আপনাদের ভালো লেগে থাকে, তবে আপনারা ও এগুলোকে আপনাদের কাজের ভিত্তি বানাতে পারেন।’


অসাধারণ এই লেখাটি আমাদের সকলের জীবনে পথচলার জন্য অমূল্য উপদেশ। সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য তিনি উক্ত প্রবন্ধে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন।


শাহ আবদুল হান্নান ইসলামি অর্থনীতি, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি নিয়ে বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন:
১. ইসলামি অর্থনীতিতে সরকারে ভ‚মিকা
২. ইসলামি অর্থনীতি দর্শন ও কর্মকৌশল
৩. নারী সমস্যা ও ইসলাম
৪. নারী ও বাস্তবতা
৫. সোস্যাল ল অব ইসলাম
৬. দেশ সমাজ ও রাজনীতি
৭. বিশ্বচিন্তা
৮. সোভিয়েত ইউনিয়নে ইসলাম
৯. উসুল আল ফিকহা
১০. ল ইকনোমিক অ্যান্ড হিস্টোরি।


শাহ আবদুল হান্নান অনেক বড়মাফের মানুষ ছিলেন। মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেন নাই। বিশ্ববিদ্যালয় পড়েছেন। সরকারি চাকরি শেষে অবসর জীবনে নিজেকে পরকালের জন্য তৈরি করেছেন। তিনি ছিলেন দ্বীনের প্রকৃত খাদেম। তাঁর চরিত্র, আমল আখলাক ছিল উঁচুমাপের মর্দে মোজাহিদের মতো।


আমার সঙ্গে শাহ আবদুল হান্নানের পরিচয় খুবই অল্প দিনের। তবে দীর্ঘ জীবন তাকে দেখেছি। তার কর্মতৎপরতা পর্যবেক্ষণ করেছি। তার লেখনি সব সময় পড়েছি। নীরব সমাজকর্মী ছিলেন তিনি। কখনো কারো সম্পর্কে খারাপ কথা বলতে শুনি নাই। সব সময় ‘পজেটিভ’ চিন্তা তার ছিল। জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার চিন্তা-চেতনা নিয়ে তিনি চলতেন।
আমার ব্যবসা জীবন শুরুতে ১৯৮২ সালে প্রথম তার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ হয়। সবেমাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে ব্যবসা শুরুর উদ্যোগ নিয়ে। তৈরি পোশাক শিল্প নিয়ে আমার ব্যবসার যাত্রা। ১৯৮৩ সালে আমরা চার বন্ধু মিলে তৈরি পোশাক শিল্প স্থাপনের জন্য ইয়ূথ গার্মেন্ট লিঃ নামে কোম্পানি করে ঢাকায় ২৯ এয়ারপোর্ট রোডে কাজ শুরু করি। ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে সবেমাত্র তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরু হয়েছে। এজন্য বন্ডেড ওয়্যার হাউজ লাইসেন্স নিতে হয়। প্রথম দিকে নানা জটিলতা ছিল এই লাইসেন্স পাওয়া নিয়ে। অবশ্য পরে ধীরে সহজ হয়ে পড়ে। আমি আমার কোম্পানির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মরহুম ফিরোজ আলমসহ শাহ আবদুল হান্নান সাহের সরকারি অফিসে দেখা করি। বললাম আমাদের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বন্ডেড ওয়্যার হাউজ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছি। আপনি একটু বলে দিলে হয়তো দ্রুত লাইসেন্সটা পেয়ে যাবো। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে টেলিফোন করলেন। বললেন, আমার স্নেহের ছোট ভাই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে। একটু দেখবেন কি করা যায়। এটুকু বলা শেষ বলা। বেশি কিছু বললেন না। তাই দ্রæত আমরা লাইসেন্স পেয়ে গেলাম। তারপর আর তেমন দেখা সাক্ষাৎ হয় নাই বললে চলে। তবে পরবর্তীতে বিভিন্ন সভায়, সেমিনারে তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। সব সময় ভালো ভালো পরামর্শ দিতেন।


সর্বশেষ শাহ আবদুল হান্নানের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ও আলোচনা হয় জাতীয় শরিয়া কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় অফিসে। আমি তখন ইসলামিক ফাইনেন্স এন্ড ইনভেস্টমেন্টের (IFIL) চেয়ারম্যানের দায়িত্বে। তা ২০১৮ সালের কথা।
শাহ আবদুল হান্নানের মৃত্যুর পর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার সম্পর্কে ব্যাপক লেখালেখি শুরু হয়েছে। ৩ জুন ’২১ দেনিক প্রথম আলো পত্রিকায় সাবেক সচিব মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ‘উত্তর গোড়ান নিবাসী সচিবের কথা’ শিরোনামে একটি স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধ লিখেছেন। লেখার শেষ অংশে ফাওজুল কবির খান বলেন-


“আর্থিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার যে নজির শাহ আবদুর হান্নান রেখে গেছেন, তা বিরল। আমি ক্ষণজন্মা এই মানুষটির আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। তাদের সন্তান ইমু ও ফয়সালের প্রতি সমবেদনা। তাদের বলি, এমন একজন মানুষকে পিতা হিসেবে পাওয়া যে কোনো সন্তানের জন্য একটি বিরল সম্মান। আর নিজেদের বলি, এমন একজন সরকারি কর্মকর্তা পাওয়া জাতির জন্য ভাগ্যের বিষয়।’


আমরা আজ শাহ আবদুল হান্নানের মতো একজন দক্ষ, সৎ ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিকে হারিয়েছি। আমি ছাত্র জীবন থেকে তাকে চিনতাম, জানতাম। কিন্তু তার অনেক লুকায়িত গুণের কথা আজ শুনছি। মানুষের চরিত্রের এমন সুন্দর গুণ লুকায়িত আছে যেনে আজ অবাক হচ্ছি। আমরা জানি সরকারি চাকরি করলে সরকারি প্লট পাওয়া কোনো ব্যাপার নয়। শুধু সরকারি কর্মকর্তা কেন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা পর্যন্ত সরকারি প্লটের মালিক হয়েছেন। কিন্তু তিনি গোড়ানে নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি রয়েছে বলে সরকারি প্লটের জন্য আবেদনও করেন নাই। কেন মিথ্যা বলবেন যে ঢাকায় তার কোনো জমিজমা নাই। কেমন সততা। এক অপূর্ব নজির। এমন কি সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণ সরকারি কর্তাদের নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু তিনি সরকারি খরচে বিদেশ যেতেও রাজি ছিলেন না। এটিকে তিনি নিজের আমানতের খেয়ানত মনে করতেন।


তার অফিস ছিল সকলের জন্য উন্মুক্ত, তিনি ছিলেন ছোট-বড় সকলের নিকট সহজলভ্য। এটাও ছিল তার বিশেষ গুণ। ভ্যাট আইন প্রবর্তনের তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে আসল ব্যক্তি। আজ দেশ উপকৃত ভ্যাট আইনের মাধ্যমে। রাত দিন পরিশ্রম করে তিনি যখন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন তখন ভ্যাট আইন প্রণয়ন ও কার্যকরী করার বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। আজ আমরা তার পরিশ্রমের সুফল পাচ্ছি।


একজন আদর্শ মানুষের সকল গুণের অধিকারী ছিলেন শাহ আবদুল হান্নান। ব্যক্তি জীবনে, পারিবারিক জীবনে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে যে সততা, নিষ্ঠা, আদর্শের পরিচয় দিয়েছেন তা এ সমাজে খুবই বিরল। অপূর্ব, শিক্ষণীয়, ঈর্ষণীয় চরিত্রের অধিকারী তিনি ছিলেন।


আজ শাহ আবদুল হান্নান সম্পর্কে লিখতে গিয়ে নানা কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। অনেক কথা ভুলেই গিয়েছি। তবে বার বার মনে পড়ে তিনি অতি আস্তে সুন্দরভাবে স্বল্প কথায় ইসলামের দাওয়াত দিতেন। যখনি তার সাথে দেখা হয়েছে তিনি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়ার কাজে জড়িত হতে বলতেন। নিজেও সব সময় এই কাজটি নিখুঁতভাবে করেছেন। সরকারি চাকরি করতেন। কিন্তু সরকারি চাকরিতে থাকাকালীন কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়ে কাজ করেননি। তবে তিনি ইসলামি আদর্শে মনেপ্রাণে, চরিত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেই আদর্শে বলিয়ান ছিলেন।


একদিন পত্রিকায় আমার একটি লেখা পড়ে আমাকে ফোন করে ধন্যবাদ জানালেন। তিনি তা না করলেও পারতেন। কিন্তু এত বড় মানুষের অধিকারী হয়েও অন্যের ভালো কাজের প্রশংসা করতে ভুল করতেন না। তিনি আমাকে আরো বললেন, তুমি লিখে যাও। লেখা বন্ধ করো না। সবসময় লিখবে।


সমাজ সচেতন মানুষ শাহ আবদুল হান্নান। সামাজিক নানা কাজে নিজেকে আজীবন জড়িয়ে রেখে ছিলেন। ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অতুলনীয়। অবসর জীবনে ইসলামি ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। তিনি বলতেন, এই দায়িত্ব আমার ইবাদতের অংশ। আন্দোলনের অংশ। ইসলামি শরীয়া বোর্ড গঠন ও তার কার্যক্রম নিয়ে তিনি সবসময় সক্রিয় ছিলেন। ইবনে সিনা ট্রাস্ট, ইবনে সিনা হাসপাতাল, ইবনে সিনা মেডিক্যাল কলেজ, মানারত স্কুল, মানারত বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি ব্যাংক হাসপাতাল, ইসলামি ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজসহ বহু প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। ইসলামি অর্থনীতির একজন যোগ্য, জ্ঞানী গবেষক হিসেবে শাহ আবদুর হান্নান স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।


শাহ আবদুর হান্নানের মতো একজন কৃতীমান মানুষের বিদায় সমাজে শূন্যতা সৃষ্টি করে। তাই করেছে। আর একজন শাহ আবদুল হান্নান কবে আমাদের সমাজে আসবে জানি না। তিনি চলে গিয়েছেন। কিন্তু তার আদর্শ, চিন্তা, লেখনি, উপদেশ আমাদের মাঝে মজুত রয়েছে। তা থেকে আমাদের শিক্ষা নিয়ে আগামীতে পথ চলতে হবে। তার সর্বশেষ বিশটি উপদেশমূলক লেখা সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য অতি সুন্দর পথ নির্দেশনা, আল্লাহপাকা তাকে পরকালের সর্ব উচ্চ মর্যাদায় স্থান দিক এই দোয়া করি।

The post শাহ আবদুল হান্নান : আমাদের পথচলার আদর্শ appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
https://chintavabna.com/shah-abdul-hannan/feed/ 0
মহাশ্মশান মহাকাব্য কবি কায়কোবাদের অমর সৃষ্টি https://chintavabna.com/mohakobi-kaykobad/ https://chintavabna.com/mohakobi-kaykobad/#comments Wed, 28 Jul 2021 17:39:47 +0000 https://chintavabna.com/?p=574 বাংলা ভাষায় সর্ববৃহৎ মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’ এর রচয়িতা কবি কায়কোবাদ। কায়কোবাদ তৃতীয় পানি পথের যুদ্ধের বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে এই মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭৯০। তৃতীয় পানি…

The post মহাশ্মশান মহাকাব্য কবি কায়কোবাদের অমর সৃষ্টি appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
বাংলা ভাষায় সর্ববৃহৎ মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’ এর রচয়িতা কবি কায়কোবাদ। কায়কোবাদ তৃতীয় পানি পথের যুদ্ধের বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে এই মহাকাব্য ‘মহাশ্মশান’। পৃষ্ঠা সংখ্যা ৭৯০। তৃতীয় পানি পথের যুদ্ধ হয়েছিল ভারতীয় মুসলমান ও মারাঠা শক্তির মধ্যে। সেই যুদ্ধে মারাঠারা মুসলমানদের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করেছিল। ‘মহাশ্মশান’ লিখে কায়কোবাদ বাংলা সাহিত্যে তার আসন অক্ষয় করে রেখে গিয়েছেন।


১৮৫৭ সালে কায়কোবাদ ঢাকা নওয়াবগঞ্জ থানার এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫১ সালে ২১ জুলাই তিনি মহাপ্রয়ানে যাত্রা করেন। তার গ্রামের নাম আগলা পূর্বপাড়া। তার পিতার নাম শাহ রহমতউল্লাহ আল কোরায়শী ওরফে এমদাদ আলী। তিনি পেশায় একজন আইনজীবী ছিলেন। মায়ের নাম জরিফুন্নেসা খাতুন।


কায়কোবাদ বাড়িতে আরবি ফারসি শিখতেন। তখন মুসলমান সমাজে ইংরেজি শিক্ষাকে হারাম মনে করত। তিনি গ্রাম থেকে ঢাকা এসে সদরঘাটের পগোজ স্কুলে ভর্তি হন। এখানেই শুরু হয় তার প্রকৃত শিক্ষাজীবন। এক বছর পর পিতা মারা যান। তিনি গ্রামে ফিরে যান। গ্রামের এক মাদ্রাসায় ভর্তি হন। সেই সময় তিনি মাদ্রাসার পাঠ্য বইর চেয়ে বেশি কাব্য সাহিত্যের বই পড়তেন। কবিতা লেখার চেষ্টা করতেন। ধীরে ধীরে তার কবিতা লেখা এক রকম নেশা হয়ে পড়ল। ছাত্রজীবন থেকে তিনি কবি হিসেবে পরিচিত হয়ে পড়েন।


এক সময় তার লেখা কবিতাসমূহ নিয়ে দুইটা ছোট কবিতার বই বের করেন। একটির নাম ছিল ‘কুসুমকানন’ অন্যটির নাম ‘বিরহবিলাপ’। তখনকার কাশিম বাজারের মহারানি কবিতা গ্রন্থ দুইটি পড়ে দশ টাকা এবং কাশীর ভুবনমোহনী চতুর্ধারিণী পাঁচ টাকা উপহার পাঠিয়ে এই কিশোর কবিকে অভিনন্দন জানান। ফলে কবির লেখনীস্পৃহা বেড়ে যায় বহুগুণে।


প্রবেশিক পরীক্ষা দিতে পারেননি। অল্প বয়সে পোস্ট মাস্টারের চাকরি নেন। গ্রামে থাকেন। ১৯৩২ সাল পর্যন্ত ঐ চাকরি করেন। যৌবনে কায়কোবাদ তার মামা হেদায়েত আলী বড় মেয়ে তাহেরুন্নেসা খাতুনকে বিয়ে করেন।


চাকরি জীবন এবং কবিতা লেখা একসঙ্গে চলতে থাকে। আমাদের স্কুল জীবনে কায়কোবাদের কবিতা পাঠ্য বইতে ছিল। আজও মনে পড়ে তার বিখ্যাত ‘আযান’ কবিতা:


‘ কে ঐ শোনাল মোরে আযানের ধ্বনি।
মর্মে মর্মে সেই সুর, বাজিল কি সুমধুর
আকুল হইল প্রাণ, নাচিল ধমনী।
কি মধুর আযানের ধ্বনি!’


বাংলা সাহিত্যে কায়কোবাদকে ‘মহাকবি’ বলা হয়। তার প্রকৃত নাম কাজেম আল কোরায়সী। মীর মোশাররফ, কায়কোবাদ, মোজম্মেল হকের মধ্যে কায়কোবাদই হচ্ছে সর্বতোভাবে একজন কবি। কাব্যের আদর্শ ও প্রেরণা তার মধ্যেই লীলাময় হয়ে ওঠে। সেজন্য অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলা যায় আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম কবি কায়কোবাদ।


বিশিষ্ট লেখক মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ তার ‘পাঁচ শত মনীষীর জীবন কথা’ গ্রন্থে মহাকবি কায়কোবাদ সম্পর্কে বলেন:


“চাকরি জীবন ও কবিতা লেখা এক সঙ্গে চলছিল। অনেক কবিতা জমা হয়ে গেছে। তিনি বই ছাপাতে মনস্থ করলেন। কয়েকজন প্রকাশকের কাছে গেলেন। কিন্তু কেউ তার বই ছাপাতে আগ্রহ দেখালেন না। শেষে এক মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী তার বই প্রকাশে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন। মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীর টাকায় কায়কোবাদ ১৩০২ বঙ্গাব্দে বের করলেন তার ‘অশ্রুমালা’ কাব্যগ্রন্থটি।’


অশ্রæমালা কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর কায়কোবাদ কবি হিসেবে বেশ প্রশংসিত হন। দেশের নানা কবি সাহিত্যিক তার প্রশংসা করলেন। বিশেষ করে তখনকার আলীপুর থেকে কবি নবীব চন্দ্র সেন কবিকে লিখেছিলেন –


‘মুসলমান যে বাংলা ভাষায় এমন সুন্দর কবিতা লিখতে পারে, আপনার বই ‘অশ্রুমালা’ না পড়লে তাহা বিশ্বাস হইত না।’


এই সকল প্রশংসাবলী কায়কোবাদ কাব্য রচনায় বিশেষভাবে উৎসাহিত করলো। তিনি ভাবলেন, হ্যাঁ তাকে লিখতে হবে। লিখতে হবে এমনভাবে যাতে করে মুসলমানরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারে, তাদের অতীত ইতিহাস ছিল অত্যন্ত গৌরবমণ্ডিত।


কায়কোবাদ ছিলেন দেশের কবি, মানুষের কবি, মানবতার কবি। তিনি দেশ ও জাতিকে নিয়ে চিন্তা করতেন। দেশকে ভালোবাসতেন। দেশের মানুষের মর্যাদা, সম্মান, গৌরব কীভাবে ফিরে আসবে তা নিয়ে নিয়ত ভাবতেন, লিখতেন। তাই তার ‘দেশের বাণী’ কবিতায় তারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে:


‘কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী?
এ দেশের লোক যারা,
সকলইতো গেছে মারা,
আছে শুধু কতগুলো শৃগাল শকুনি!
সে কথা ভাবিতে হায়
এ প্রাণ ফেটে যায়,
হৃদয় ছাপিয়া উঠে- চোখ ভরা পানি।
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী!
এ দেশের লোক যত
বিলাস বাসনে রত
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা।
দেশ গেল ছারেখারে,
এ কথা বলিব কারে?
ভেবে ভেবে তবু মোর হয়ে গেছে সারা!
প্রাণভরা হাহাকার
চোখ ভরা অশ্রুধার,
এ হৃদি যে হয়ে গেছে মরুভ‚মি-পারা!


মহাকবি কায়কোবাদ মাত্র প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ না হয়ে কাব্য সাধনায় খ্যাতি অর্জন করেন। বহু কাব্যগ্রন্থ রচনা করে তিনি মুসলিম জাতিকে সাহিত্য চর্চার নতুন দর্শন দেখিয়ে গিয়েছেন। কিশোরকাল থেকে তার কবিতা তখনকার পাঠকসমাজে বহুল সমাদৃত। ১৯৩২ সালে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য আন্দোলনের মূল অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন কবি কায়কোবাদ। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯২৫ সালে নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘ তাকে ‘কাব্যভ‚ষণ,’ ‘বিদ্যাভ‚ষণ,’ ও ‘সাহিত্যরতœ’ উপাধিতে ভ‚ষিত করেন।


কবির কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: বিরহ বিলাপ (১৮৭০) তার প্রথম কাব্য। কুসুমকানন (১৮৭৩), অশ্রুমালা (১৮৯৬), মহাশ্মশান (১৯০৪), শিবমন্দির বা জীবন্ত সমাধি (১৯২১), অমিয় ধারা (১৯২৩), শ্মশানভষ্ম (১৯২৪), মহররম শরীফ (১৯৩৩), শ্মশান ভসন (১৯৩৮), প্রেমের বাণী (১৯৭০), প্রেম পরিজাত (১৯৭০) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।


কোনো কোনো গবেষকদের মতে কবির অশ্রæমালা কাব্যগ্রন্থটি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। কিন্তু প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৬ সালে। ‘বিরহ বিলাপ’ কাব্যগ্রন্থটি প্রথম তার প্রকাশিত হয় ১৯৭০ সালে। কবির অধিকাংশ কাব্যগ্রন্থ বৃটিশ আমলে প্রকাশিত হয়। তথ্য সূত্রে দেখা যায়, ‘প্রেমের বাণী’ ও ‘প্রেম পারিজাত’ এই দুইটি কাব্যগ্রন্থ ১৯৪৭ সালের পর পাকিস্তান আমলে প্রকাশিত হয়েছে। কবি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন ১৯৫১ সালের ২১ জুলাই। ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।


যখন মুসলিম সমাজ নানাভাবে অবহেলিত ছিল, মুসলমানদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চা ছিল না যখন ইংরেজি শেখা ‘হারাম’ বলে কিছু লোক ‘ফতোয়া’ দিত, তখনকার সমাজে একজন প্রগতিশীল, সৃজনশীল সৃষ্টিশীল কবি কায়কোবাদের আগমন। জাতিকে পথ দেখার জন্য, চলার শক্তি যোগানোর জন্য তার সকল সৃষ্টি। তাই তার কবিতায় বেজে ওঠে –


‘বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা আমার জন্মভ‚মি।
গঙ্গা পদ্মা যাচ্ছে ব’য়ে,
যাহার চরণ চুমি।
ব্রহ্মপুত্র গেয়ে বেড়ায়,
যাহার পুণ্য গাথা!
সেই সে আমার জন্মভ‚মি,
সেই সে আমার মাতা!
আমার মায়ের সবুজ আঁচল
মাঠে খেলায় দুল!
আমার মায়ের ফুল বাগানে,
ফুটছে কতই ফুল!
শত শত কবি যাহার।
গেয়ে গেছে গাথা!
সেই সে আমার জন্মভ‚মি,
সেই সে আমার মাতা!
আমার মায়ের গোলা ছিল,
ধন ধান্যে ভরা!
ছিল না তার অভাব কিছু,
সুখে ছিলাম মোরা!
বাংলা মায়ের স্নিগ্ধ কোলে,
ঘুমিয়ে রব আমি!
বাংলা আমার মাতৃভাষা
বাংলা জন্মভ‚মি!
সূত্র: কবির লেখা- ‘বঙ্গভ‚মি ও ভঙ্গভাষা’ কবিতা

The post মহাশ্মশান মহাকাব্য কবি কায়কোবাদের অমর সৃষ্টি appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
https://chintavabna.com/mohakobi-kaykobad/feed/ 1
ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ : জ্ঞানতাপস বাংলা ভাষার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব রক্ষায় অনির্বাণ https://chintavabna.com/dr-muhammad-shahidullah/ https://chintavabna.com/dr-muhammad-shahidullah/#respond Sat, 10 Jul 2021 10:16:37 +0000 https://chintavabna.com/?p=565 ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।’ শব্দগুলো উচ্চারণ করেছিলেন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি ১৯১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর কলকাতায়…

The post ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ : জ্ঞানতাপস বাংলা ভাষার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব রক্ষায় অনির্বাণ appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।’ শব্দগুলো উচ্চারণ করেছিলেন জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। তিনি ১৯১৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলন’ এর দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে আরও বলেন, ‘আমরা বঙ্গদেশবাসী। আমাদের কথাবার্তায়, ভয়-ভালোবাসায়, চিন্তা ও কল্পনার ভাষা বাংলা। তাই আমাদের মাতৃভাষা বাংলা।’


ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ উক্ত সভায় আরও বলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাস আলোচনা করে দেখ, মাতৃভাষায় উন্নতি ছাড়া কোনো জাতি কি কখনও বড়হতে পেরেছে? আরব পারস্য জয় করেছিল, কিন্তু পারস্য আরবের ভাষা নেয়নি। শুধু নিয়েছিল তার ধর্মভাব আর কতগুলো শব্দ। সেদিন অতি কাছে যেদিন বাংলা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ভাষার স্থান অধিকার করবে। বিদেশি ভাষার সাহায্যে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চার মতো সৃষ্টি ছাড়া প্রথা কখনও টিকতে পারে না।’
‘এখন আমাদের শিক্ষিত সমাজের রুচি সাধুভাষার দিকে। এখন এই ভাষায় চলবে। এ ভাষায়ই লেখাপড়া করতে হবে। এতেই আমাদের ভাবী বাংলার মুসলমান সাহিত্য রচনা করতে হবে। এটাই হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালি জাতির ভাষা হবে।’


মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৮৮৫ সালে ১০ জুলাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চব্বিশ পরগনা জেলার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম মুনশী মফিজউদ্দিন আহমেদ। তার পিতা হাড়োয়া গ্রামের গোরাচাঁদের প্রাচীন দরগাহর একজন খাদেম ছিলেন। ১৯২১ সালে তিনি ঢাকা এসে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।


ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯০৪ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন। তিনি ১৯০৬ সালে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ এবং ১৯১০ সালে সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতিতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। ১৯১২ সালে তিনি তুলনামূলক ভাষাতত্তে¡ এমএ পাস করেন। ১৯১৪ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনও পাস করেন। ১৯১৯ সালে তিনি স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের আহ্বানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপক ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের গবেষণা সহকারী পদে যোগদান করেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর তিনি সংস্কৃত ও বাংলাভাষা বিভাগে লেকচারার পদে যোগদান করেন।


১৯২৬ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি প্যারিস যান। ধ্বনিতত্তে¡ প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।


ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার সারাটা জীবন জ্ঞান সাধনায় কাটিয়েছেন। জ্ঞান চর্চা, জ্ঞান অন্বেষণ, জ্ঞান আহরণের তার আনন্দ আর্তি আর উল্লাস। জ্ঞান বিতরণই ছিল তার শান্তি। তিনি মাতৃভাষা বাংলা ছাড়া আরও ১৮টি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তার জীবনের ৮৪ বছর বয়সের মধ্যে ৭৫ বছর শিক্ষা ও জ্ঞান অন্বেষণের সাধনার জীবনে ইংরেজি, ফারসি, জার্মান, সংস্কৃত পালি, প্রাকৃত, আরবি, উর্দু, বৈদিক, আবেস্তান, তিব্বতি, সিংহলি, হিন্দি, মৈথলী, আসাম ও উড়িষ্যা প্রভৃতি দেশ-বিদেশের ভাষা আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বলতেন, ‘সাধনা করলেই সিদ্ধি লাভ হয়।’


ড. এনামুল হকের মতে- ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি হইলেও জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নেহের দুলাল এবং প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরপুত্র। প্রকৃতপক্ষে তিনি সভ্য জগতের তিন তিনটি খ্যাতনামা এবং প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানধারার ত্রিবেনী সঙ্গম। এই জ্ঞান তীর্থে স্নাত হইলে পুণ্য অর্জিত হয় কিনা বলা যায় না, তবে মন যে মুক্ত, প্রাণ যে উদার, হৃদয় যে বিশাল এবং মস্তিষ্ক যে জ্ঞানগর্ভ হইয়া ওঠে, তাহাতে অপরের না হোক, অন্তত আমার কোনো সন্দেহ নাই।’


ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রাচ্যের আল-বেরুনি নামে সকলের নিকট পরিচিত। তিনি ৮৪ বছর জীবিতকালে তার কর্মক্ষেত্রে এবং সাহিত্য সংস্কৃতিতে অশেষ অবদান রেখে গেছেন।
শহীদুল্লাহ সব সময়ই সাহিত্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এমএ পাসের পর তিনি বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির সম্পাদক হন। ১৯৪৮ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন। তিনি উর্দু অভিধান প্রকল্পের সম্পাদক ছিলেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হচ্ছে:
ভাষা ও সাহিত্য, বাংলা ভাষার ইতিহাস, দীওয়ানে হাফিজ, রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম, নবী করিম মুহাম্মদ, ইসলাম প্রসঙ্গ, বিদ্যাপতি শতক, বাংলা সাহিত্যের কথা ২ খণ্ড, বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, ব্যাকরণ পরিচয়, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, মহররম শরীফ, টেইল ফ্লম দি কুরআন, Bnddhist Mystic songs (1960), Hundred sayings of the Holy Prophet উল্লেখযোগ্য।
আজ খুব বেশী করে মনে পড়ে এই জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে। তাতে অনেক কারণ রয়েছে। ভাষা, শিক্ষা ও ইসলামের ক্ষেত্রে তার অবদান স্মরণীয়। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ উল্লেখিত সব ভাষা শিক্ষা এবং ধর্ম চর্চাকে ইবাদত মনে করতেন। এসব ক্ষেত্রে তিনি তাই অবদান রেখে গেছেন।


আজ আমরা তার অবদানের কথা অনেকটা ভুলে গিয়েছি। তরুণসমাজ তাকে নিয়ে তেমন যেন চর্চা করছে না। অনেকে বলেন, তিনি ১৮টি ভাষা জানতেন, আবার অনেকে উল্লেখ করেছেন তিনি ২০টি ভাষা জানতেন। সব চেয়ে বড় পরিচয় তিনি ৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মূল পথিকৃত ছিলেন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয় ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দিন যখন পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে প্রস্তাব পেয়েছিলেন তখন ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ তার প্রতিবাদে দৈনিক আজাদে এক প্রবন্ধ লিখে অতীত জাগরুক করেন।


ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন বাংলা ভাষার প্রকৃত গবেষক। তার গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নির্মাতা হিন্দুও নয় মুসলমানও নয় – বৌদ্ধতান্ত্রিক সম্প্রদায়। অবশ্য রূপে রসে একে সজিব করেছেন মুসলিম আমির উমরাহরা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাই প্রমাণ করেছেন সংস্কৃত থেকে নয়, বাংলা ভাষার উদ্ভব হয়েছে ‘ গৌড়ি প্রকৃত’ থেকে। যেমন বাংলায় ‘তুমি ঘোড়া দেখ’ গৌড়িতে হবে ‘তুন্থে ঘোড়া অংদেক খহ’।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ তার গবেষণা দেখিয়েছেন সংস্কৃতিতে ‘ঘোড়া’ শব্দ নাই। আছে ‘অশ্ব’। গৌড়ি প্রকৃত (পালি ভাষায়) ‘ঘোটক’ শব্দ পাওয়া যায় ঘোড়া সেখান থেকেই বাংলা ভাষায় এসেছে। ১৯১৬ সালে হর প্রসাদ শাস্ত্রী নেওয়ার বৌদ্ধদের কাছ থেকে কতগুলো পুঁথি সংগ্রহ করেন। ঐ সকল পুঁথি বৌদ্ধ দোহা বা সঙ্গীত রয়েছে। এই সঙ্গীতগুলো তখন প্রাচীন বাংলার নিদর্শন। শহীদুল্লাহ ঐ বৌদ্ধ গানের ওপর ডক্টর অব থিসিস করেন।
১৯৫২ সালে একুশের সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিন থাকাকালে তিনি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ভাষা আন্দোলনের সূচনা করেন।


তিনি বলতেন, ভাষার বৈচিত্র আল্লাহতায়ালারই সৃষ্টি। মানবচিত্তে আল্লাহতায়ালাই ভাষার বীজ রোপণ করে দিয়েছেন। তিনি বাংলা ভাষার গঠন, বৈশিষ্ট্য ও বিকাশের জন্য আজীবন সাধনা করে গেছেন। তিনি তাই লিখেছেন, বাংলাভাষার সহজ ব্যাকরণ, আঞ্চলিক ভাষার অভিধান ও ইসলামি বিশ্বকোষ। তিনি পবিত্র কোরআন শরীফের তাফসিরও করেছেন।


অবাক হওয়ার বিষয যে, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এত বড় শিক্ষিত পণ্ডিত ব্যক্তি হয়েও খাঁটি মুসলমান ছিলেন। ধর্মের সঠিক আকিদা তিনি পোষণ করতেন। ধর্ম নিয়ে তার কোনো বাড়াবাড়ি ছিল না। এখনও আমাদের সমাজে মানুষ সাধারণত একটু উচ্চশিক্ষিত হলেই ইসলাম সম্বন্ধে ভুল ধারণা করে বসে। এটা তাদের অজ্ঞতার জন্য। অনেকে নতুন নতুন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ জুড়ে দেয় ধর্মে। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মধ্যে এসব ছিল না। আমরা বলব ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চিরদিনের শিক্ষিতদের শিক্ষক, সাধারণ মানুষের পথপ্রদর্শক, গোটা মুমিন মুসলমানের আদর্শ। বিদ্যা আর আগুন দান করলেই, বাড়ে যা- তা তিনি কাজকর্মে, আদর্শে, চর্চায় প্রমাণ করে দেখিয়ে গেছেন।


তিনি ১৯৬৯ সালে ১৩ জুলাই আমাদের ছেড়ে পরপারে চলে গেলেন। তখন তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
আজ তাই দুঃখ হয় অনেক অবহেলা, অযত্নে যখন দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কার্জন হলে ঢুকতে বাম পার্শ্বে তার কবর, আদি প্রাচীন জীর্ণ মসজিদ সামনে। কেউ যখন স্মরণ করে না, যত্ন করে না। জন্ম ও মৃত্যু দিবসে এসে দলে দলে জিয়ারত করে না। অনেক দিন পর এখন তার কবরে একটি সাইন বোর্ড লাগানো হয়েছে। আমরা যখন সত্তর দশক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ি তখন তার কবর চেনার জন্য কোনোসাইন বোর্ডও দেখতে পাইনি। আমাদেরঘুমন্ত জাতি আবারও জেগে উঠুক জ্ঞানতাপস, ধার্মিক, পণ্ডিত ড. মুহম্মাদ শহীদুল্লাহ সাহিত্য চর্চা করে।


ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ অসংখ্য পুরস্কার ও পদক লাভ করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে প্রথম এমেরিটাস অধ্যাপক পদ প্রদান করেন। একই বছর ফ্রান্স সরকার তাকে সম্মানজনক পদক ‘নাইট’ অব দি অর্ডারস অব আর্টস অ্যান্ড লেটার্স দেয়। ঢাকা সংস্কৃতি পরিষদ তাকে ‘বিদ্যাবাচস্পতি’ উপাধিতে ভ‚ষিত করেন। পাকিস্তান আমলে তাকে ‘প্রাইভ অফ পারফরম্যান্স পদক’ (১৯৫৮) ও মরণোত্তর ‘হিলাল ই ইমতিয়াজ খেতাব’ প্রদান করে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশন্স তাকে সম্মানিত সদস্য (ফেলো) রূপে মনোনীত করে কিন্তু পাকিস্তান সরকারের অনুমতি না থাকায় তিনি তা গ্রহণ করতে পারেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে মরণোত্তর ‘ডিলিট’ উপাধি দেয়। ১৯৮০ সালে তাকে বাংলাদেশ সরকার মরণোত্তর স্বাধীনতা পদক প্রদান করে সম্মানিত করেন।
ভাষা ক্ষেত্রে তার অমর অবদানকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা হলের নাম পরিবর্তন করে শহীদুল্লাহ হল করে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একটি কলা ভবনের নাম তার নামে অলংকৃত করে।

The post ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ : জ্ঞানতাপস বাংলা ভাষার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব রক্ষায় অনির্বাণ appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
https://chintavabna.com/dr-muhammad-shahidullah/feed/ 0
অধ্যাপক আবুল ফজল : বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী https://chintavabna.com/professor-abul-fazal/ https://chintavabna.com/professor-abul-fazal/#comments Thu, 01 Jul 2021 15:03:39 +0000 https://chintavabna.com/?p=558 “মানুষকে মানুষ হিসেবে এবং মানবিকবৃত্তির বিকাশের পথেই বেড়ে উঠতে হবে আর তার যথাযথ ক্ষেত্র রচনাই মানব কল্যাণের প্রাথমিক সোপান। সে সোপান রচনাই সমাজ আর রাষ্ট্রের…

The post অধ্যাপক আবুল ফজল : বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
“মানুষকে মানুষ হিসেবে এবং মানবিকবৃত্তির বিকাশের পথেই বেড়ে উঠতে হবে আর তার যথাযথ ক্ষেত্র রচনাই মানব কল্যাণের প্রাথমিক সোপান। সে সোপান রচনাই সমাজ আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সমাজের ক্ষুদ্রতম অঙ্গ বা ইউনিট পরিবার- সে পরিবারকেও পালন করতে হয় এ দায়িত্ব। কারণ, মানুষের ভবিষ্যৎ জীবনের সূচনা সেখান থেকেই। ধীরে ধীরে ব্যাপকতর পরিধিতে যখন মানুষের বিচরণ হয় শুরু, তখন সে পরিধিতে যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সংযোগ ঘটে তা শিক্ষা কিংবা জীবিকা সংক্রান্ত যা হোক না তখন সে দায়িত্ব এসব প্রতিষ্ঠানের ওপরও বর্তায়। তবে তা অনেকখানি নির্ভর করে অনুক‚ল পরিবেশ ও ক্ষেত্র গড়ে তোলার ওপর।”


অধ্যাপক আবুল ফজল ওপরের কথাগুলো তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘মানব কল্যাণে’ বলেন। উক্ত প্রবন্ধে তিনি আরও বলেন-
“রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু প্রশাসন চালানোই নয়, জাতিকে আত্মমর্যাদাসম্পন্ন করে তোলাও রাষ্ট্রের এক বৃহত্তর দায়িত্ব। যে রাষ্ট্র হাতপাতা আর চাটুকারিতাকে প্রশ্রয় দেয়, সে রাষ্ট্র কিছুতেই আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক সৃষ্টি করতে পারে না। তাই মানব কল্যাণ অর্থে আমি দয়া বা করুণার বশবর্তী হয়ে দান-খয়রাতকে মনে করি না। মনুষ্যত্বেও অবমাননা যে ক্রিয়াকর্মেও অবশ্যম্ভাবী পরিণতি তাকে কিছুতেই মানবকল্যাণ নামে অভিহিত করা যায় না।”


অধ্যাপক আবুল ফজল বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি একাধারে শিক্ষাবিদ, সুযোগ্য অধ্যাপক, চিন্তাবিদ, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার এবং একজন রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তি।
আবুল ফজল ১৯০৩ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রামের সাতকানিয়াউপজেলার কেঁওচিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মৌলভী ফজলুর রহমান এবং মা গুলশান আরার একমাত্র পুত্র সন্তান। প্রাথমিক পড়ালেখা শুরু হয় গ্রামের প্রাইমারি স্কুল থেকে। প্রকৃতির প্রত্যক্ষ সান্নিধ্যে তার শৈশবের দিনগুলো অতিবাহিত হয়েছে। তাই তার স্মৃতি কথায় তিনি লিখেছেনÑ
“আমাদের ছেলেবেলা বেশ কিছুটা বেপরোয়াভাবেই কেটেছে। বিশেষত যতদিন গ্রামে ছিলাম জীবনটা ছিল রীতিমতো উদ্দাম। … একটু বড় হয়ে দূর দূর গ্রামেও চলে যেতাম যাত্রা কি কবি গান শুনতে … চাঁদনিরাতে ছেলেরা ‘বদর’ দিয়ে উঠলে কিছুতেই ঘরে স্থির থাকতে পারতাম না।”


গ্রাম থেকে বাবার সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরে এসে নন্দনকাননে এক হাইস্কুল সংলগ্ন প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হই। ১৯১৩/১৪ সালে আবুল ফজল চট্টগ্রাম সরকারি মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯২৩ সালে তিনি মেট্রিক পাস করেন। ১৯২৫ সালে ঢাকা ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেন। ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ^বিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেন।


শিক্ষকতাকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৩১ সালে বিটি পাস করে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের দ্বিতীয় মৌলভী হিসেবে কিছুদিন চাকরি করেন। চট্টগ্রাম কলেজ আলী হাইস্কুলে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজ করার পর ১৯৩৩ সালে খুলনা জেলা স্কুলে দ্বিতীয় পÐিতের পদে স্থায়ীভাবে যোগদান করেন।
১৯৩৭ সালে খুলনা ছেড়ে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে সহকারী ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪১ সালে কৃষ্ণনগর কলেজের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৩ সালে যোগ দেন চট্টগ্রাম কলেজে। ১৯৫৯ সালে তিনি চাকরি থেকে অবসর নেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা পরিষদের শিক্ষা বিষয়ক বিষয়ে দায়িত্ব পালন করেন।


অধ্যাপক আবুল ফজল শিক্ষকতার সঙ্গে সঙ্গে সাহিত্য চর্চা করে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তিনি সমাজ ও সমকাল সচেতন সাহিত্যিক এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমধিক খ্যাত। ছাত্রজীবনেই যুক্ত হন মুক্তবুদ্ধিরআন্দোলন, অন্যদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন মুসলিম সাহিত্য সমাজ। কথা শিল্পী হিসেবে পরিচিতি আইন করলেও তিনি ছিলেন মূলত চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক। তার প্রবন্ধে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে গভীর ও স্বচ্ছ দৃষ্টির পরিচয় বিধৃত। আধুনিক অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধ, স্বদেশ ও ঐতিহ্যপ্রীতি, মাবনতা ও শুভবোধ তার সাহিত্যকর্মেও মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
আবুল ফজল সাহিত্যের গভীরতা, চিন্তা, ভাবনা ও ইচ্ছা বুঝতে হলে তার সাহিত্য চর্চা করতে হবে। তার লেখা ‘মানবতন্ত্র (১৯৭২) গ্রন্থে কিছু অংশ তার চিন্তা গভীরতার পরিচয় বহন করে। তাই নিচে কিছু অংশ উল্লেখ করলাম। তিনি বলেন-
“আমাদের বিশাল মুক্তবুদ্ধির সহায়তায় সুপরিকল্পিত পথেই কল্যাণময় পৃথিবী রচনা সম্ভব। একমাত্র মুক্ত বিচারবুদ্ধির সাহায্যেই বিজ্ঞানের অভাবনীয় আবিষ্কারকে ধ্বংসের পরিবর্তে মানব কল্যাণ হয়ে উঠবে মানব মর্যাদার সহায়ক।”
আবুল ফজল মুসলিম সাহিত্য সমাজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ‘শিক্ষা’ নামক একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। বাংলা সাহিত্যে অধ্যাপক আবুল ফজল এক বিশেষ স্থান দখল করে গিয়েছেন। সাহিত্য চর্চায় তার সৃষ্টি গ্রন্থসমূহ হচ্ছে :
রোজনামচা,
জীবন পথের যাত্রী,
রাঙ্গা প্রভাত (১৩৬৪),
চৌচির (১৯৩৪),
মাটির পৃথিবী (১৩৪৭),
আয়শা,
আবুল ফজলের শ্রেষ্ঠ গল্প,
সাহিত্য সংস্কৃতি ও জীবন,
সমাজ সাহিত্য রাষ্ট্র,
শুভবুদ্ধি (১৯৭৪),
সমকালীন চিন্তা,
রেখাচিত্র,
সফরনামা,
দুর্দিনের দিনলিপি,
প্রদীপ ও পতঙ্গ,
মানবতন্ত্র,
রবীন্দ্রনাথ,
জীবন পথের যাত্রী,
দিনলিপি, রাঙা প্রভাত, আলোক লতা,


অধ্যাপক আবুল ফজল ছিলেন অত্যন্ত রাজনৈতিক সচেতন সাহিত্যসেবী। তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে কোনো অন্যায়, অনাচার, দুর্নীতি ঘটলে নীরব থাকতেন না। নিবন্ধ লিখে, বিবৃতি দিয়ে তিনি সব সময় তার প্রতিবাদ করে গিয়েছেন। এজন্য তাকে ‘জাতির বিবেক’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। তিনি ছিলেন সর্বপ্রকার কুসংস্কার, কুপমন্ডুকতা, গোঁড়ামি আর ধর্মান্ধতার বিরোধী।


১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টজাতির জনককে হত্যার সঙ্গে সঙ্গেসাত বছরের শিশু রাসেলকে হত্যা করা হয়েছিল, তিনি তখন একটা গল্প ‘মৃতের আত্মা’ লিখে ও পত্রিকায় ছাপিয়ে এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তিনি সব সময় জাতির ক্রান্তিলগ্নে দিকনির্দেশনা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে গিয়েছেন।
৭১-এর শহীদ অধ্যাপক কামাল পাশা ‘কথাশিল্পী আবুল ফজল’ নামে একটি বই রচনা করে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন।


সাহিত্য সাধনায় অফুরন্ত অবদানের জন্য ২০১২ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ প্রদান করা হয়। তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬২), প্রেসিডেন্ট প্রাইড অব পারফরম্যান্স সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৩), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬০), নাছিরুদ্দীন স্বর্ণ পদক (১৯৮০), মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), আব্দুল হাই সাহিত্য পদক (১৯৮২), রাষ্ট্রীয় সাহিত্য পুরস্কার এবং সমকাল পুরস্কার লাভ করেছেন।
জাতির এই বিবেক অধ্যাপক আবুল ফজল ১৯৮৩ সালের ৪ মে ৮০ বছর বয়সে ধরণী থেকে বিদায় গ্রহণ করেন।

The post অধ্যাপক আবুল ফজল : বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
https://chintavabna.com/professor-abul-fazal/feed/ 1
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের আত্মার শক্তি https://chintavabna.com/kazi-nazrul-islam/ https://chintavabna.com/kazi-nazrul-islam/#comments Fri, 21 May 2021 18:37:25 +0000 https://chintavabna.com/?p=416 বল বীর-বল উন্নত মম শির।শির নেহারি আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!বল বীর-বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়িচন্দ্র সূর্য গ্রন্থ তারা ছাড়িভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়াখোদার আসন আরশ…

The post জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম <BR>আমাদের আত্মার শক্তি appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>

বল বীর-
বল উন্নত মম শির।
শির নেহারি আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রন্থ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া,
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর!
মমললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটিকা
দীপ্ত জয়শ্রীর!
বল বীর-
আমি চির উন্নত শির!

১৯২২ সালের ৬ই জানুয়ারি ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি। উপরে কিছু অংশ লেখা হলো। ব্যাপক পাঠক প্রিয় ও জনপ্রিয় হয়ে উঠে নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা। তখনকার ভারত বর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের মৌলিক ক্ষেত্র তৈরিতে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ এক অসাধারণ ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তাই তখনকার রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দ নজরুলকে ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসাবে আখ্যায়িত করে। কবি হলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জন্ম ১১ই জ্যেষ্ঠ ১৩০৬, ২৪শে মে ১৮৯৯ সাল। জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গ, মহকুমা আসানসোল, চুরুলিয়া গ্রামে, থানা জামুরিয়া। ডাক নাম ‘দুখু মিয়া’। পিতা কাজী ফকির আহমদ, মাতা জাহেদা খাতুন।

কবি নজরুল গবেষক আব্দুল মান্নান সৈয়দ ১৯৯৬ সালে ‘শ্রেষ্ঠ নজরুল’ গ্রন্থের ভুমিকায় নজরুল সম্পর্কে বলেন-
“আজ বিংশ শতাব্দীর এই সর্বশেষ দশকে এসে একে ঠিক অবিসংবাদিত সত্য বলে মনে হচ্ছে না যে, বাঙালির সমগ্র সংস্কৃতিকে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর একজনই সবচেয়ে ব্যাপক গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন- তিনি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাঙালি হিন্দু মুসলমানকে নজরুল ছাড়া আর কে এমনভাবে মেলাতে চেয়েছেন? বাঙালি মুসলমানদের চিরকালের উৎস ও কেন্দ্র নজরুল ছাড়া আর কে? শেষ পর্যন্ত মানতে বাধ্য হই আমরা, রবীন্দ্রনাথ ব্যতীত প্রতিভার এই সব্যসাচীত্ব ও চূড়াবিহারী সাফল্য আর কারো অর্জনে নেই। কেমলমাত্র কবিতা ও সঙ্গীত দ্বারাই গত ৭৫ বছরের অধিক কাল ধরে তিনি অগনন মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে আছেন। মাত্র ২৩ বছরের সৃষ্টিশীল জীবন তার ১৯১৯-৪২। কিন্তু তারই মধ্যে কতরূপে তিনি আত্মপ্রকাশ করেছেন। একাধারে কবি, গল্পকার, উপন্যাসিক, নাট্যকার, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক, সমালোচক, শিশু সাহিত্যিক, গীতিকার, গীতালেখ্য ও গীতিনাট্য রচয়িতা, সুরকরা, স্বর লিপিকার, গায়ক, বাদক, সঙ্গীতজ্ঞ ,সঙ্গীত পরিচালক, সাংবাদিক, সম্পাদক, পত্রিকা পরিচালক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র কাহিনীকার, চলচ্চিত্র পরিচালক।”


কবি নজরুলের জীবন বড়ই কঠিন, কঠোর যুদ্ধের মধ্যে থেকে বেড়ে উঠা। ১৯০৮ সালে কবির পিতার মৃত্যুর পর তিনি শিশুকাল থেকে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে বড় হয়ে উঠেন। শিশুকাল থেকে আমরা কবি নজরুলকে জানি । তার কবিতা, ছড়ার সঙ্গে আমাদের বেড়ে উঠা। তাই আজও মনে পড়ে

কাঠবেড়ালি! কাঠবেড়ালি! পেয়ারা তুমি খাও?
গুড়-মুড়ি খাও? দুধ-ভাত খাও? বাতাবি লেবু? লাউ?
বেড়াল বাচ্চা? কুকুর ছানা? তাও?-
ডাইনী তুমি হে্যাঁৎকা পেটুক
খাও একা পাও যেথা যেটুক।

শিশুকালে মায়েদের মুখে মুখে বার বার বলতে শুনেছি কবি নজরুলের ছোটদের ছড়া, কবিতা। ছোট বাচ্চাদের কোলে নিয়ে মা যখন বলতেন

ভোর হলো
দোর খোলো
খুকুমণি ওঠো রে
ঐ ডাকে
যুঁই শাখে
ফুল-খুকি ছোটো রে।

তখন কত মধুর শোনাতো। মুখে মুখে, শোনে শোনে ছড়াটি আমাদের মনের মধ্যে গেঁথে রয়েছে। স্কুল জীবনে নজরুলের ছড়া, কবিতা ছাড়া কোন সংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো না। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে প্রতি বছর সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমরা আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতাম। আর সেই অনুষ্ঠানে নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘খুকি ও কাঠবেড়ালি’ লিচু-চোর, সংকল্প, প্রজাপতি, শিশু যাদুকর প্রভৃতি শিশু কিশোর কবিতা আমরা এক একজন আবৃত্তি করে পুরস্কার পেয়ে যেতাম। আমাদের মায়েরা গ্রামে, শহরে আজও নজরুলের সেই বিখ্যাত ‘ঘুম পাড়ানী গান’ গেয়ে শিশুদের দোলনায় দিয়ে ঘুম পাড়াতে চেষ্টা করে। কিনা সুন্দর সেই লাইনসমূহ :

ঘুম পাড়ানী মাসি পিসি ঘুম দিয়ে যেয়ো
বাটা ভরে পান দেবো গাল বরে খেয়ো
ঘুম আয়রে, ঘুম আয় ঘুম।
ঘুম আয়রে, দুষ্টু খোকার ছুঁয়ে যা,
চোকের পাতা লজ্জাবতী লতার মত নুয়ে যায়।
ঘুম আয় রে, ঘুম আয় ঘুম।

আধুনিক বাংলা কবিতার দুশো বছরের ইতিহাসে কবি নজরুল ইসলাম অন্যতম প্রধান কবি। বিশিষ্ট লেখক, গবেষক, সাহিত্যিক ড. আনিসুজ্জামান বলেন

অবিসংবাদী রবি কাব্যচ্ছায়া থেকে তিনিই প্রথম বাংলা কবিতাকে মুক্ত করেন অন্য কয়েকটি ধারা প্রবাহিত করেন। নজরুল ইসলাম হয়ে উঠেন ‘জাতীয়তাবাদী কাব্যনায়ক, বাংলা কবিতার প্রথম স্বার্থক সাম্যতন্দ্রের উদগাতা, নিপীড়িত ও শোষিত শ্রেণীর মানুষের বন্ধু, হিন্দু মুসলমান সৌভ্রাত্বের প্রতীক, আন্তর্জাতিক মিলনের পরিপোষক।

নজরুলের প্রথম প্রকাশিত কবিতা মুক্তি। এই কবিতা শ্রাবণ ১৩২৬ সালে ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায়’ প্রথম প্রকাশিত হয়। নজরুলের কবিতার যে মহত্বের সাক্ষ্য পাওয়া তাঁর সৃষ্টি তিনটি ধারার মধ্যে। এক. জাগরণের কবিতায় ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে দুই. সজ্জীবনী শোনিত প্রবাহিত তিন. ইমেজোচ্ছল কাব্যধারায়। নজরুল ছিলেন একাধারে বিশ ও ত্রিশ দশকের কবি, বিশের দশকের রাজা হয়ে তিনি ছিলেন কল্লোল যুগের অন্যতম নায়ক।

কবি নজরুলের আবির্ভাব রবীন্দ্র যুগে। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রধারা অনুসরণ করেন নাই। তিনি নতুন ধারার সাহিত্য রচনা করেন। তাঁর কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস নতুনত্বের সৃষ্টিতে উল্লাস বেয়ে বেড়িয়েছে। আপন ধারার অমর সৃষ্টি নজরুরের সাহিত্যকর্মে। তাই দেখা যায় কবি গুরুর ‘আজি হতে শতবর্ষ” কবিতা পড়ে কবি নজরুল ১৪০০ সাল নামে যে কবিতা লেখেন তাতে তার ব্যতিক্রমী সাহিত্য সৃষ্টির নতুনরূপ আমরা দেখতে পাই। কবি বলেন

আজি হতে শতবর্ষ আগে
যে কবি, স্মরণ তুমি করেছিলে আমাদের
শত অনুরাগে,
আজি হতে শতবর্ষ আগে।

নজরুলের সাহিত্যে ইসলামী চেতনা, মুসলিম ঐতিহ্য ইতিহাস, আল্লাহ প্রতি অগাধ বিশ্বাস, সমাজ ও সংস্কৃতি অন্য রকম স্থান দখল করে রয়েছে। ইসলামী সঙ্গীত, গজল, গান বাংলা সাহিত্যে নজর অদ্বিতীয়। গানের রাজা নজরুল। চার হাজারের অধিক তিনি গান রচনা করেন। ইসলামী কবিতা, গান, গজল এর পাশাপাশি তিনি অন্য ধর্মের মূল বিষয় ও তার সাহিত্যে নিয়ে আসেন।

নজরুল মুসলিম জাতিকে তার হারানো জীবনের ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে নতুন করে আবার কর্মময় জীবন শুরুর আহ্বান জানান। তাই কবিতার জাগরণের বার্তা আমাদের জীবনকে উজ্জীবিত করে। কবি বলেন-

জুলফিকার” আর “হায়দরী” হাঁক হেথা আজো হযরত আলীর
শাতিল আরব! শাতিল আরব!! জিন্দা রেখেছে তোমার তীর।
ললাটে তোমার ভাস্কর টিকা
বসরা-গুলের বহ্নিতে লিখা

ছোট গল্প, প্রবন্ধ সাথে সাথে অনুবাদ সাহিত্যে নজরুরের সাহিত্য কর্ম ভরপুর। আরবী, ফার্সি, উর্দু, হিন্দি ভাষায় নজরুল ছিলেন পারদর্শী। পবিত্র কোরআনের কাব্যিক রূপ নজরুল ছাড়া অন্য কেউ এত নিপুণভাবে দিতে পারেন নাই। পবিত্র কোরআনের ত্রিশ পারা তিনি কাব্যিক ভাষায় চমৎকারভাবে পাঠকের জন্য রুপ দেন।পবিত্র কোরআনের ছোট্ট সুরা ইখলাস নজরুলের কাব্যিক রূপ:

শুরু করিলাম পূত নামেতে আল্লার
শেষ নাই সীমা নাই যার করুণার!
বলো, আল্লাহ এক! প্রভু ইচ্ছাময়
নিষ্কাম নিরপেক্ষ, অন্য কেহ নয়।
করেন না কাহারেও তিনি যে জনন,
কাহারও ঔরস-জাত তিনি নন।
সমতল তাঁর
নাই কেহ আর।।

নজরুল সাহিত্যে গান, গজল ও ইসলামী সঙ্গীত এক বিশাল স্থান দখল করে আছে। বাংলা সাহিত্যে নজরুলের চেয়ে এত বেশি গান আর কেহ রচনা করে যেতে পারেন নাই। এমন কি রবীন্দ্রনাথের চেয়ে অনেক বেশি গানের স্রষ্টা কবি নজরুল ইসলাম। তাই তিনি বলেন-

“কাব্য ও সাহিত্য আমি কি দিয়েছি, জানি না, কিন্তু সঙ্গীতে যা দিয়েছি, সে সম্বন্ধে আজ কোন আলোচনা না হলেও ভবিষতে এ যখন আলোচনা হবে, ইতিহাস লেখা হবে, তখন আমার কথা সবাই স্বরণ করবে। এ বিশ্বাস আমার আছে”।

নজরুল আধুনিক বাংলা গান এর সঙ্গে সঙ্গে গজল, কোরাস, ইসলামী সঙ্গীত সৃষ্টিতে অতুলনীয়। আমাদের ঈদে, পর্বে, ধর্মীয় যে কোন অনুষ্ঠানে নজরুলের গান ছাড়া চলে না। আমাদের রমজান, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, মহররমসহ সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নজরুলের গীত শুরু ও শেষে দর্শকের জন্য অতি আনন্দের। পবিত্র কোরআন, মহানবী (সাঃ) ,পবিত্র কাবা, পবিত্র মদীনা প্রভৃতি উল্লেখ করে নজরুলের গান আমাদের হৃদয়কে আপ্লুত করে। রমজান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বেতার, টিভিগুলো সুরে সুরে বেজে উঠে-

ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে
এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে
শোন্্ আসমানী তাকিদ।

ধর্মের প্রতি নজরুলের বিশ্বাস, চিন্তা, ধারণা এত গভীর ছিল যা সমাজের উঁচু স্তরের দীনি ব্যক্তিদের থেকে থাকে। আল্লাহপাকের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও রসুলের প্রতি গভীর ভালবাসা তার কাব্যে, কবিতায়, গানে আমাদেরকে সব সময় স্মরণ করিয়ে দেয়। গভীর ধর্মীয় অনুভূতি ও বিশ্বাস কবিকে সব সময় দৃঢ় শক্তির উপর দাঁড়িয়ে রেখেছিল। তাই তাঁর কবিতার সুর আমাদের মনকে করে দৃঢ়, শক্ত ও মজবুত।

রোজ হাশরে আল্লাহ আমার করোনা বিচার।
বিচার চাহি না, তোমার দয়া চাহে এ গুনাহগার।
আমি জেনেশুনে জীবন ভরে
দোষ করেছি ঘরে পরে,
আশা নাই যে যাব তরে বিচার তোমার
বিচার যদি করবে কেন রহমান নাম নিলে।
ঐ নামের গুণেই তরে যাব, কেন এ জ্ঞান দিলে।
দ্বীন ভিখারী বলে আমি
ভিক্ষা যখন চাইব স্বামী
শূন্য হাতে ফিরিয়ে দিতে পারবে না কো আর

কবি নজরুলের অপূর্ব সৃষ্টি ছোট গল্প, উপন্যাস ও বিভিন্ন বিষয় ভিত্তিক প্রবন্ধসমূহ নজরুলকে তাঁর প্রকৃত স্বরূপে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দেয়। তাঁর বিখ্যাত ছোট গল্প ব্যাথার দান, হেনা, রাক্ষুসী, শিউলিমালা, পদ্ম গোখরা প্রভৃতি পড়ে আমরা আনন্দ পাই। ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাস তখনকার সমাজের প্রকৃত চিত্র পাঠকে আজও মোহিত করে।

প্রবন্ধ রচনায় নজরুল ছিলেন বেশ সিদ্ধহস্ত নজরুলের বিখ্যাত প্রবন্ধসমূহ তখনকার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সংস্কৃতি চিত্রকে জাতির সামনে সুন্দরভাবে তোলে ধরে। তিনি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা চেয়েছেন। স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছেন। জেলে খেটেছেন। নির্যাতিত হয়েছেন।

নজরুলের বিখ্যাত প্রবন্ধ “আমার লীগ কংগ্রেস’ প্রবন্ধে নজরুল বলেন-
“আমার কবিতা, আমার শক্তি নয়, আল্লাহর দেওয়া শক্তি আমি উপরক্ষ মাত্র! বীণার বেনুতে সুর বাজে কিন্তু বাজান যে-গুণী, সমস্ত প্রশংসা তাঁরই। আমার কবিতা যাঁরা পড়েছেন, তাঁরাই সাক্ষী: আমি মুসলিমকে সঙ্ঘবদ্ধ করার জন্য তাদের জড়ত্ব, আলস্য, কর্মবিমুখতা, ক্লৈব, অবিশ্বাস দুর করার জন্য আজীবন চেষ্টা করেছি। বাংলার মুসলমানকে শির উঁচু করে দাঁড়াবার জন্য যে শির এক আল্লাহ ছাড়া কোন সম্রাটের কাছেও নত হয়নি- আল্লাহ যতটুকু শক্তি দিয়েছেন তাই দিয়ে বলেছি, লিখেছি ও নিজের জীবন দিয়েও তার সাধনা করেছি।”

কবি নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। সব সময় আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে বা বেসরকারিভাবে নজরুলকে রাষ্ট্রীয় কবির মর্যাদা দিয়ে আসছি। কিন্তু সেই দিন ২৯শে আগস্ট, কবির মৃত্যু দিবসে তাঁর সমাধিতে পুষ্প অর্পণের পর বিশিষ্ট কবি প্রেমিক, শিল্পী ফেরদৌসী রহমান বলেন কবি ও আজও রাষ্ট্রীয় আইন প্রণয়নের মাধ্যমে জাতীয় কবি হিসাবে স্বীকৃতির বিষয়টি মীমাংসা হয়নি। এখনও সংসদ কর্তৃক আইন পাশের মাধ্যমে কবিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদার আইনগত স্বীকৃতি প্রদান করা বাকী রয়েছে। শোনে খুবই অবাক হলাম। কেন বিষয়টি এমনিভাবে ঝুলে রয়েছে। সব সরকার তো কবিকে জাতীয় কবি হিসাবে মর্যাদা দিয়ে আসছেন। ১৯৭২ সালের ১৪শে মে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান কবি নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য নিয়ে আসেন। ১৯৭৬ সালে জানুয়ারী মাসে শহীদ জিয়াউর রহমানের সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেন। ১৯৭৬ সালে কবিকে একুশে পদক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর “আর্মি ক্রেস্ট” উপহার দেয়া হয়। ২৭ শে আগস্ট ১৯৭৬ , বাংলায় ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ সালে জিয়াউর রহমান নিজ হাতে কবিকে মসজিদ পাশে সমাহিত করেন। যা কবির শেষ ইচ্ছা পূরণের আকুলতা বাস্তবে রূপ পেল। কবির আল্লাহ প্রেম, ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং পরকালরমুখীর কামনায় তার কবিতায় যে সুর বেজে উঠে:

“মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই।
যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।
আমার গোরের পাশ দিয়ে ভাই নামাজীরা যাবে,
পবিত্র সেই পায়ের ধ্বনি এ বান্দা শুনতে পাবে।
গোর-আজাব থেকে এ গুনাহগার পাইবে রেহাই।
কত পরহজেগার খোদার ভক্ত নবীজীর উম্মত
ঐ মসজিদে করে রে ভাই কোরান তেলাওয়াত।
সেই কোরান শুনে যেন আমি পরান জুড়াই।”

কত দরবেশ ফকির রে ভাই, মসজিদের আঙ্গিনাতে
আল্লাহর নাম জিকির করে লুকিয়ে গভীর রাতে,
আমি তাদের সাথে কেঁদে কেঁদে
(আল্লাহর নাম জপতে চাই)।।

কবি আজ আমাদের মাঝে নাই। কিন্তু কবির আদর্শ, লেখা আমাদের মাঝে বিরাজমান। তাঁর কর্মময় জীবনের শিক্ষা আমাদের জাতীয় জীবনের শিক্ষা। কবি নজরুলের জন্ম শত বার্ষিকীর চমৎকার স্লোগানটি আজ অনেক বেশি মনে পড়ে “বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং কাজী নজরুল ইসলাম এক ও অবিভাজ্য। এর চেয়ে বড় সত্য আর কিছু হয় না। যত দিন যাচ্ছে এই উচ্চারণের তাৎপর্য ও গুরুত্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে। এখন বলবার সময়, নজরুল বা নজরুল চর্চাকে ছোট করা, খাটো করা কিংবা সরিয়ে রাখা বা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার অর্থ বাংলাদেশের অস্তিত্বের মৌল কাঠামোতে আঘাত করা। বাংলাদেশের বেচে থাকা, তার অহংকার এবং আত্মপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে সংকুচিত করা, তাকে নিজ ভূমি থেকে উদ্বাস্তু করা।”

কবি নজরুল ইসলাম আমাদের আত্মার শক্তি। নজরুল চর্চা আজ আমাদের জাতীয় সত্তার বিকাশের জন্য অপরিহার্য। জাতি হিসাবে আমাদের বিকাশ, সমৃদ্ধি, সুখ, শান্তি সব কিছুই নজরুলের জন্য। যে কোন বিচারে নজরুল বিকল্প আমাদের নেই।

The post জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম <BR>আমাদের আত্মার শক্তি appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
https://chintavabna.com/kazi-nazrul-islam/feed/ 1
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের মূল চালিকাশক্তি https://chintavabna.com/rabindranath-thakur-bangla-shahitter-mul-chalikashokti/ https://chintavabna.com/rabindranath-thakur-bangla-shahitter-mul-chalikashokti/#comments Fri, 07 May 2021 23:33:20 +0000 https://chintavabna.com/?p=392 আমার মাথা নত করে দাও হে তোমারচরণধূলার তলে।সকল অহংকার হে আমারডুবাও চোখের জলে।নিজেরে করিতে গৌরব দাননিজেরে কেবলই করি অপমান,আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়াঘুরে মরি পলে পলে।সকল…

The post রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর <BR> বাংলা সাহিত্যের মূল চালিকাশক্তি appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>

আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার
চরণধূলার তলে।
সকল অহংকার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে।
নিজেরে করিতে গৌরব দান
নিজেরে কেবলই করি অপমান,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া
ঘুরে মরি পলে পলে।
সকল অহংকার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে।

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতার প্রথমাংশ। একজন শিল্পী হিসাবে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উৎকর্ষ নিয়ে কিছু বলা অতিকথন। কিন্তু একজন পুরোদস্তুর রোমান্টিক কবি, কীভাবে কথা সাহিত্যেও শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠেন তা কৌতুলোদ্দীপক, একই সাথে অনুধাবনের অগম্যও বটে। কারণ আধুনিক কথা সাহিত্য অনেক বেশী বাস্তবতাসংলগ্ন, আর কবিতার সঙ্গে যদিও বাস্তবতার একটা যোগ থেকে যায়, তথাপি কবিতা যতটা না বাস্তবের তার চেয়ে বেশী অতিবাস্তবের বা কল্পনার।


১৯১৩ সালে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। “কাব্যের অতি উচ্চমাপের সংবেদনশীল, পরিশুদ্ধ ও সৌন্দর্য্যমন্ডিত পংক্তির জন্য, যার মাধ্যমে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তার কাব্যিক চিন্তা-চেতনা নিজস্ব ইংরেজী শব্দে প্রকাশ করতে সমর্থ হয়েছেন, যা পশ্চিমা সাহিত্যেরই একটি অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।”


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২৫শে বৈশাখ ১২১৮, ৭ই মে ১৮৬১ সালে কলকাতার এক ধনাঢ্য ‘সংস্কৃতিবান ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৪১ সালে ৭ আগস্ট, ২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।


তিনি ছিলেন একজন কবি, উপন্যাসিক, সঙ্গীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোট গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কন্ঠশিল্পী, ও বড় মাপের দার্শনিক। বাংলা ভাষায় তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তিনি যার লেখা গান আমার সোনার বাংলা বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। আর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম হচ্ছেন আমাদের জাতীয় কবি। ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের রচিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘জনগণ মন’ গানটি ভারতের জাতীয় সঙ্গীত। আর শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত ১৯৩৮ সালে ঠাকুরের লেখা একটি বাংলা গানের উপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছিল। এটি সিংহলীতে অনুবাদ হয়েছিল এবং ১৯৫১ সালে যা শ্রীলংকার জাতীয় সংগীত হিসাবে গৃহীত হয়েছিল। তাই রবি ঠাকুর একজন বাঙালি ব্যক্তিত্ব তিনি তিনটি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা।
আমাদেও জাতীয় সঙ্গীত হচ্ছে:

আমার সোনার বাংলা,
আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস
আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি ||
ওমা, ফাগুনে তোর আমের বনে
ঘ্রাণে পাগল করে,
মরি হায়, হায় রে-
ও মা অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে
আমি কি দেখেছি মধুর হাসি ||
কী শোভা, কী ছায়া গো,
কী স্নেহ, কী মায়া গো-
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে,
নদীর কুুলে কুলে।
মা, তোর মুখের বাণী আমার কানে
লাগে সুধার মতো,
মা, তোর বদনখানি মলিন হলে,
ওমা, আমি নয়ন জলে ভাসি

“একজন চূড়ান্ত আধ্যাত্মবাদী কবি কিভাবে তার উপন্যাসে দ্ব্যর্থহীনভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পারেন যে ভারতবর্ষ বা সমগ্র মানবতার মুক্তির একমাত্র উপায় সকল ধর্মমতের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবে দেখার ঐকান্তিক ইচ্ছা এবং সংকল্প? এই কৃটভাসের একমাত্র ব্যাখ্যা এটা নয় যে রবীন্দ্রনাথ আসলে অধ্যাত্মবাদী নন, বরং এটাই যে রবীন্দ্রনাথকে শুধু অধ্যাত্মবাদী বা শুধু বাস্তববাদী বলে প্রমাণ করা সম্ভব নয়; যদি কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় তাকে ফেলতেই হয় তাহলে একমাত্র “সংশয়বাদী’ বলাই অধিকতর যৌক্তিক বলে মনে হয়।”

উপরের বক্তব্যটি মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম ‘গোরা’ উপন্যাসের ভ‚মিকায় লিখেছেন ২০১৭ সালে। জনাব মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম আরও বলেন,
“ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথ বাঙালা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠদের কাতারে, কিন্তু উপন্যাসেও তাকে শ্রেষ্ঠদের তালিকায় রাখতে হয়তো দ্বিতীয়বার চিন্তা করার অবকাশ থাকতো, যদি এবং কেবল যদি তিনি ‘গোরা’ উপন্যাসটি না লিখতেন। এই একটি উপন্যাস দিয়ে তাকে অনায়াসে আমাদের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসিকদের সারিতে রাখতে বাধ্য হতে হয়। গোরা শুধু তার না, বাঙালা সাহিত্যেরই একটা শ্রেষ্ঠ উপন্যাস একথা বলতে আমাকে দুইবার ভাবতে হয় না।”


সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো বাঙালা উপন্যাসেও রবীন্দ্রনাথকেই তাই পথ প্রদর্শক বলতে হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাধারে কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, ছোট গল্পকার, প্রবন্ধকার। প্রথম উপন্যাস ‘করুণা’ তিনি লিখেছিলেন মাত্র ১৬ বছর বয়সে। বাইশ বছর বয়সে লেখেন ‘বউ ঠাকুরানীর হাট”। তার সামাজিক উপন্যাস হচ্ছে ‘যোগাযোগ’, চোখের বালি, নৌকা ডুবি ইত্যাদি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু গল্পই বলেন না, চরিত্র গঠনে জড়িয়ে থাকে এক গভীর জীবন দর্শন। জীবনে মানসিকভাবে নিজকে তৈরী করত সাহায্য করে তার কয়েকটি ছোট উপন্যাস। যেমনঃ নষ্টনীড়, চতুরঙ্গ, দুই বোন প্রভৃতি। ‘শেষের কবিতা’ তার জীবনের সেরা উপন্যাস।
রবীন্দ্রনাথের কাব্য সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা, চিত্ররূপময়তা, অধ্যাত্মচেতনা, মানব প্রেম, রোমান্টিক সৌন্দয্যচেতনা, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা।


রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস, ৩৬টি প্রবন্ধ, দুই হাজারের অধিক গান রচনা করেছেন। দুই হাজারের অধিক তিনি ছবি এঁকেছিলেন। ১৯১৩ সালে তিনি ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের ইংরেজী অনুবাদের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেন। এই কাব্যটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১১ সালে। ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্য গ্রন্থের প্রথম কবিতাটি পাঠকের জন্য প্রথম ১০টি লাইন নিবন্ধের শুরুতে আমি উল্লেখ করেছি।


বাংলা সাহিত্যে প্রথম স্বার্থক ছোট গল্পকার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বলতে গেলে বলা যায় হিতবাদী, সাধনা, ভারতী, সবুজপত্র প্রভৃতি মাসিক পত্রিকাগুলোর চাহিদা পূরণের জন্য তিনি ছোটগল্প রচনা করেছিলেন। তার গল্পগুলো অতি উচ্চ সাহিত্যমূল্যসম্পন্ন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৮৯১ সাল থেকে ১৮৯৫ সাল ছিল সর্বাপেক্ষা প্রথম তিন খন্ডের ৮৪টি গল্পের অর্ধেক রচিত হয় এই সময় কালের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উল্লেখযোগ্য গল্প হচ্ছেঃ কঙ্কাল, নিশীথে, মহিহারা, ক্ষুধিত পাষাণ, স্ত্রীর পত্র, নষ্টনীড়, কাবুলিওয়ালা, হৈমন্তী, দেনাপাওনা, মুসলমানীর গল্প ইত্যাদি। শেষ জীবনে লিপিকা, সে ও তিন সঙ্গী গল্পগ্রন্থে নতুন আঙ্গিক রচনা করেছিলেন।


রবীন্দ্রনাথ তার গল্পে পারিপার্শ্বিক ঘটনাবলী ও আধুনিক ধ্যান-ধারণা সম্পর্কে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করতেন।
রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প অনুযায়ী চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। নাটক ও নির্মিত হয়েছে। পোষ্টমাষ্টার, সমাপ্তি, চারুলতা, মণিহারা, কাবুলিওয়ালা ও ক্ষুধিত পাষাণ প্রভৃতি গল্প নিয়ে সিনেমা নির্মিত হয়েছে।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘তোতা কাহিনী’ গল্পে বিদ্যালয়ের মুখস্থ শিক্ষাকে তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন। ১৯১৮ সালে তিনি বিশ্বভারতী বিদ্যালয় নিয়ে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে শান্তি নিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন। নতুন ধারায়, নতুন পদ্ধতি, মূল্যবোধ সম্পন্ন মুক্ত জীবন গঠনের শিক্ষার আলো হাতে তিনি ভ‚মিকা রাখেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রাজনৈতিক দর্শন অত্যন্ত জটিল। তিনি সাম্রাাজ্যবাদের বিরোধিতা ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সমর্থন করতেন। ১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থে কয়েকটি কবিতায় তার রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়।


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বিশ্বপ্রেমিক, সুন্দরের পূজারী। তার কন্ঠ ছিল সুন্দর, কাব্য সঙ্গীত ছিল খুবই সুন্দর, গানে কবিতায় তিনি সুন্দরের মহিমা কীর্তন করে গেছেন। সমাজ জীবনে যা কিছু অসুন্দর কুৎসিত এর মধ্য দিয়ে তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। কবি পন্ডিত, দেশ প্রেমিক হিসেবে সর্বোপরি মানুষ হিসাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যে কত বড় ছিলেন তা কথায় প্রকাশ করা যায় না।


প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অনুভব করা তথা জীবনও জগতকে উপলব্ধি করার জন্য যে দূরত্ব অতিক্রম করা প্রয়োজন, তার প্রিয়জনের মৃত্যু এই দূরত্ব অতিক্রম করতে সহায়ক ভ‚মিকা পালন করছে। তা তার ‘কড়ি ও কোমল’ এ পাওয়া যায়-

মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভূবনে
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই।

‘কড়ি ও কোমলে’ কবি আত্ম প্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারেননি। কিন্তু মানসীতে পেরেছেন। তাই কবি বলেছেন

“মানসীতে যাকে খাড়া করেছি যে মানসেই আছে
সে আর্টিস্টের হাতে রচিত ঈশ্বরের প্রথম অসম্পূর্ণ প্রতিমা।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার দীর্ঘ আশি বছরের জীবনে যেমন সাহিত্য রচনা করেছেন তেমনি মর্যাদা এবং সাফল্য ও পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সত্যিকার অর্থেই প্রতিভাবান। তিনি তার জীবনের শেষ সময় এসেও সাহিত্য রচনা করে গিয়েছেন। তিনি ছিলেন মহাসাধক, তিনি ছিলেন সত্য ও সুন্দরের কবি।


১৯১৫ সালে বৃটিশ সরকার ‘স্যার’ উপাধি (নাইটহুড) প্রদান করে। বৃটিশের প্রতি রবীন্দ্রনাথের সুধারণা, ভালবাসা বৃটিশ খুশী হয়ে এই উপাধি দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ কবি নজরুলের মত ভারতের স্বাধীনতার জন্য সক্রিয় ভ‚মিকা রাখতে দেখা যায়নি। কবিতায়, গানে, গল্পে, উপন্যাসে কিংবা নাটকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের তির্যক ভ‚মিকা দেখা যায় নাই। তবে তিনি সমাজ সেবা, শিক্ষা, সমাজ সংস্কার করে মানুষের কল্যাণের কথা বলে মানবতাবাদী কবি, দার্শনিক হিসাবে নিজকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

যেমন ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ একাধিক বক্তৃতা, গান ও কবিতায় ভারতীয় সমাজের বর্ণশ্রম প্রথা ও অস্পৃশ্যতার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
জীবনের শেষ দশক ১৯৩২-১৯৪১ রবীন্দ্রনাথের স্বর্ণযুগ। এই সময় তিনি ৫০টির অধিক গ্রন্থ রচনা করেন।


বাংলাদেশ তথা বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথ একটি বিশেষ নাম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় সমান প্রতাপের সঙ্গে বাংলা সাহিত্য, ভাষা ও সংস্কৃতিতে সমাসীন রয়েছেন। তার সর্বতোমুখী প্রতিভা, জ্ঞানের গভীরতা তাকে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি এসেছিলেন ক্ষণকালের জন্য কিন্তু হয়ে রয়েছেন সর্বকালের। ভারতীয় হয়ে তিনি বিশে^র দরবারে আসন গেড়ে নিয়েছেন মর্যাদা ও যোগ্যতা বলে। ‘বিশ^কবি’ অভিধায় অভিসিক্ত হয়ে তিনি আছেন সকল মানুষের হৃদয়জুড়ে।


‘গীতাঞ্জলি’ কাব্য গ্রন্থের জন্য তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তা ও তিনি নিজে- এই কাব্যগ্রন্থটি ইংরেজীতে অনুবাদ করেছেন। ‘গীতাঞ্জলি’ গ্রন্থের ১২৫ গীতিটি উল্লেখ করছি যা কবি নিজে ইংরেজীতে অনুবাদ করে আজও পাঠককে চমকিত করেন।

“আমার এ গান ছেড়েছে তার সকল অলংকার
তোমার কাছে রাখেনি আর সাজের অহংকার।
অলংকার যে মাঝে পড়ে
মিলনেতে আড়াল করে,
তোমার কথা ঢাকে যে তার মুখর ঝংকার।

তোমার কাছে খাটে না মোর কবির পরব করা-
মহাকবি, তোমার পায়ে দিতে চাই যে ধারা।
জীবন লয়ে যতন করি
যদি সরল বাঁশি গড়ি,
জ্ঞাপন সুরে দিবে ভরি সকল ছিদ্র তার।”

রবীন্দ্রনাথের করা ইংরেজি অনুবাদে এটি হচ্ছে-

My song has put off her adornments. She has no pride of dress and decoration.
Ornaments would mar our union; they would come between
thee and me; their jingling would drown thy whispers.

My poet’s vanity dies in shame before thy sight. O master poet, I
  have sat down at thy feet. Only let me make my life simple
and straight, like a flute of reed for thee to fill with music.

(Gitanjali, Verse VII)

কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কাব্যের দুইটি পংক্তি উল্লেখ করে নিবন্ধ সমাপ্তি টানছি-

“ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি
শ্রাবণগগণ ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি-
যারা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী”

তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চিরকাল বাংলা সাহিত্যে মূল চালিকা শক্তি হিসাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে।

The post রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর <BR> বাংলা সাহিত্যের মূল চালিকাশক্তি appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
https://chintavabna.com/rabindranath-thakur-bangla-shahitter-mul-chalikashokti/feed/ 1
‘রুমীর সংলাপ’ হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী (রঃ) অসাধারণ সৃষ্টি https://chintavabna.com/jalaluddin-rumi/ https://chintavabna.com/jalaluddin-rumi/#respond Sat, 01 May 2021 06:27:02 +0000 https://chintavabna.com/?p=344 জালালুদ্দীন রুমি (রঃ) ইসলামের ইতিহাসে একজন সর্বশ্রেষ্ঠ সুফী কবি হিসেবে স্বীকৃত, যিনি ১২০৭ সাল থেকে ১২৭৩ সাল পর্যন্ত জীবিত থেকে তাঁর লেখনীর মাধ্যমে যা দিয়ে গেছেন, তার প্রতিটি ধর্মের আধ্যাত্মিক চেতনার অনুসারীদের আকৃষ্ট করেছে শত শত বছর ধরে।

The post ‘রুমীর সংলাপ’ হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী (রঃ) অসাধারণ সৃষ্টি appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>

“তোমরা যেই হও, এসো, এসো
পথচারী, প্রার্থনাকারী, চলে যেতে আগ্রহী
যেই হও, তোমরা এসো।
আমাদের আশ্রয় হতাশার সরাইখানা নয়
এসো, যদিও তুমি শতবার ভঙ্গ করেছো
নিজের প্রতিজ্ঞা
তবুও এসো, আবার চলে এসো।”

সত্যের অনুসন্ধানীদের উদ্দেশ্যে হযরত জালালুদ্দীন রুমী (রঃ) আহ্বান উপরে উল্লিখিত কবিতায় খুবই সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। জালালুদ্দীন রুমি (রঃ) ইসলামের ইতিহাসে একজন সর্বশ্রেষ্ঠ সুফী কবি হিসেবে স্বীকৃত, যিনি ১২০৭ সাল থেকে ১২৭৩ সাল পর্যন্ত জীবিত থেকে তাঁর লেখনীর মাধ্যমে যা দিয়ে গেছেন, তার প্রতিটি ধর্মের আধ্যাত্মিক চেতনার অনুসারীদের আকৃষ্ট করেছে শত শত বছর ধরে।


‘রুমীর সংলাপ’ গ্রন্থটি সম্পাদনা ও পুনঃলিখনের কাজ করেছেন প্রফেসর এ জে আরবেরী (Prof A.J Arberry) এবং এই বইটি ইংরেজীতে প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে। আর এই গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ করেছেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। প্রকাশ করেছে ঢাকা থেকে ‘লেখালেখি’ ২০১০ সালে। রুমীর ছবি দিয়ে চমৎকার সুসদৃশ প্রচ্ছদ পাঠক্রমে সব সময় বেশ আকর্ষণ করে। ২৪৬ পৃষ্ঠায় লিখিত ‘রুমীর সংলাপ’ গ্রন্থটি সুফী সমাজে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।


রুমীর সংলাপের মূল পান্ডুলিপির সঙ্গে বর্তমান অনুদিত গ্রন্থের তুলনা করলে প্রথমে যে পরিবর্তনটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে তা হচ্ছে সাধারণ যে বাণীগুলো যেমন আল্লাহ শান্তি বর্ষণ করুন এবং তাকে শান্তি দিন, বিশেষত: কোন দরবেশ বা কোন নবীর নাম উল্লেখ করার পর ব্যবহার করা হয়েছে, যা রুমীর সমসাময়িককালে তাদের নামের সাথে এ ধরনের উচ্চারণ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য স্বাভাবিক ছিল এবং এখনো বিশ্বের কিছু কিছু অংশে তা আচরিত।


রুমীর সংলাপের মূল পান্ডুলিপির সঙ্গে বর্তমান অনুদিত গ্রন্থের তুলনা করলে প্রথমে যে পরিবর্তনটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে তা হচ্ছে সাধারণ যে বাণীগুলোযেমন আল্লাহ শান্তি বর্ষণ করুন এবং তাকে শান্তি দিন, বিশেষত: কোন দরবেশ বা কোন নবীর নাম উল্লেখ করার পর ব্যবহার করা হয়েছে, যা রুমীর সমসাময়িককালে তাদের নামের সাথে এ ধরনের উচ্চারণ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য স্বাভাবিক ছিল এবং এখনো বিশ্বের কিছু কিছু অংশে তা আচরিত।


এছাড়া রুমী অনেক স্থানে কোরআনের আয়াত উল্লেখ করেছেন এবং আলোচনার সময়ে প্রায় আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। রুমীর শ্রোতারাও যেহেতু ভালভাবে কোরআন জানতেন, অতএব, এ ধরনের উদ্ধৃতি সুপরিচিত ছিল এবং প্রসঙ্গক্রমে ব্যক্তিগত বিষয়গুলো উঠে আসতো। কিন্তু বহু পাঠকের কাছেই এই গ্রন্থ তেমন পরিচিত নয়।

রুমী তার চিন্তা, চেতনা এই গ্রন্থে অত্যন্ত সুন্দরভাবে পাঠকের জন্য বিশেষ করে তাঁর অনুসারীদের জন্য বর্ণনা করেছেন। এমনকি রুমী আজও আমাদের মৌলিক ধ্যান ধারণার অনেক কিছুকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং আমরা তা কোনভাবে বুঝতে পারি না। বিশেষ করে আমরা যদি সতর্ক না হই। কালের বিবেচনায় উত্তীর্ণ নয় অথবা সেকালের বিবেচনা করে কোন ধ্যান-ধারণাকে ভুল করে প্রত্যাখ্যান করা অত্যন্ত সহজ। অথবা যেগুলো অতি প্রচলিত মনে হয় অথবা খোঁড়া অভিমত মনে হয় সেসব সম্পর্কেও একই বক্তব্য প্রযোজ্য এখানেআমাদেরকে রুমীর উপনীত উপসংহারের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ একই ভুল করার কারণে তিনি আমাদেরকেও সনাক্ত করবেন।


যেমন রুমীর সংলাপ গ্রন্থের দ্বাদশ সংলাপে রুমী প্রশ্ন করেছেন কোন দরবেশ, যিনি আল্লাহর গোপন রত্ন (আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্য) পরে বেড়াচ্ছেন, তিনি যদি কাউকে আঘাত করে তার নাক, চোয়াল ভেঙ্গে দেন, তাহলে সেক্ষেত্রে ভুলটা কার? রুমী দাবি করেন যে, ভুল দরবেশের। ‘যেহেতু দরবেশ আল্লাহর প্রেমে মত্ত, সেক্ষেত্রে তার কোন কাজ প্রকারান্তরে আল্লাহর কাজ। কিন্তু আল্লাহ ভুল করতে পারেন, এমনটি হতে পারে না।’


নিজের কাজের জন্য যে কেউ আল্লাহকে দোষারোপ করতে পারে, কিন্তু রুমীর কথাগুলো পাঠ করে দেখা যায় যে তিনি কখনো সহিষ্ণুতাকে প্রশ্রয় দেয়ার মতো কিছু বলেননি। তিনি বলেছেন, কিভাবে কোন কাজ সঠিক বা ভুল হতে পারে। ভাল বা মন্দ হতে পারে। ভুল বা সঠিক সম্পর্কে আমাদের সাংস্কৃতিক ধারনার গভীরে দৃষ্টি দিতে বলেছেন তিনি। যার মধ্যে নিহিত আছে আল্লাহ ইচ্ছার যথার্থ কারণ।


আলোচ্য গ্রন্থে রুমী বলেন, “এই সমগ্র পৃথিবী একটি বাড়ি ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা যদি এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে যাই অথবা এক কোনা থেকে আরেক কোণায় যাই, তাহলে কি আমরা একই বাড়িতে বাস করি না? কিন্তু দরবেশেরা আল্লাহর রত্ন ধারণ করেছেন, তারা এই বাড়ি ছেড়ে আরও দূরে চলে গেছেন। মহানবী মুহাম্মদ (সাঃ) বলেন, ইসলামের সূচনা আগন্তুক হিসাবে এবং যেভাবে শুরু হয়েছিল অনুরূপ আগন্তকের মতোই ফিরে যাবে।”


এভাবেই রুমীর কথাগুলোও সময়োত্তীর্ণ হয়ে আসে এবং আমাদেরকে বলে, “তুমি কি এটা গ্রহণ করতে পার যে আল্লাহর সত্যিকার একজন প্রেমিক আল্লাহর কর্তৃত্বের অধিকারী? তুমি দেখতে পার, তারা যারা বহন করে সে কারণেই তারা সব সময় এই পৃথিবীতে আগন্তুক হিসাবে থাকে?” তাহলে কে সময়োত্তীর্ণ? অবশ্যই এমন যে কেউ যিনি তাদের সময়ের সংস্কৃতি দ্বারা আবদ্ধ। এমন যে কেউ বড় কিছু দ্বারা আলোড়িত।
আমরা যদি দেখতে পাই যে এখানে কি ঘটেছে, তাহলে আমরা দেখবো রুমী অপরীক্ষিত বিতৃষ্ণা ও অপছন্দগুলোকে ব্যবহার করেই আমাদেরকে শিক্ষা দেন। রুমীর কিছু গভীর ভাব সম্বলিত কবিতাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে এ ধরনের কন্টকের কারণে, যার ফলে তিনি পয়ত্রিশতম সংলাপে বলেছেন, “আল্লাহ মতে চমৎকারভাবে তাদের উপর সীলমোহর লাগিয়েছেন, যারা শ্রবণ করে, কিন্তু কিছু বুঝে না। তারা যুক্তিতর্ক করে, কিন্তু কিছুই শেখে না। আল্লাহ কত মহৎ ও উদার। আল্লাহর ক্রোধও বিশাল, এমনকি তিনি যে সীলমোহর করে রাখেন তাও মহৎ।”
কিন্তু সীলমোহর প্রকৃতপক্ষে সীলমোহর ছাড়া অবস্থার তুলনায় কখনো কিছু নয়। কারণ, এর মহিমা- বর্ণনাতীত ব্যাপার।


একইভাবে রুমী যখন ইসলামের উল্লেখ করেছেন, তখন তিনি আসলেই পথের কথা বলেছেন। বর্তমানে মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে আগের থেকে স্থিরকৃত যে ধারণা বিদ্যমান রুমী সেভাবে ইসলাম প্রসঙ্গে আলোচনা করেননি। তিনি আধ্যাত্মিক পথ ও ধর্মীয় ঐতিহ্য বোঝাতে ইসলামকে প্রয়োগ করেছেন। রুমী যাবোঝাতে চেয়েছেন তা উপলব্ধি করা সব সময় সহজ নয়, ঠিক রুমী নবী ও আল্লাহর কণ্ঠ হিসেবে মুহাম্মদের উল্লেখ করেছে, তাকে খুব সহজে প্রচলিত বিশ্বাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যা বাহিরের আলখেল্লা মাত্র, আসলে রুমী যা বলেছেন। এটি শুধূ এই ধরনের অন্ধত্ব যা তিনি তার সত্তর নম্বর সংলাপে উল্লেখ করেছেন, “যেখানে কোন পুরুষ নারী বড় একটি তালা লাগায়, সেখানে যেমন মুল্যবান কিছু আছে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাপ যেমন গুপ্তধন পাহারা দেয়, মানুষের কদর্মতা বিচার করে না, বরং তাদের সম্পদের গুরুত্ব বিচার করে।”
রুমীর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ, তার ছয় খন্ড বিশিষ্ট কাব্য মসনবী। অন্য কথায় ‘ফিহি মা ফিহি’ মসনবীর অর্থের ব্যাখ্যা, যা উপলব্ধির চাবিকাঠি। দুটি কাজই একটি আরেকটির সমান্তরাল। যাতে রয়েছে অনেক বিষয় ও কাহিনী, যা একটির সাথে আরেকটি জড়িত। এটি যদি সত্য হয় তাহলে অত্যন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার যে ‘রুমীর সংলাপ’ অধিক মনোযোগ আকৃষ্ট করেনি। এটি গ্রন্থের নামের একটি হলেও কোনভাবেই অতি গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আর এক পর্যায়ে ‘ফিহি মা ফিহি’ আমাদেরকে বলে দেয় আমরা যাতে এর যা গুরুত্ব তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব না দেই। এটিকে উচ্চ ধর্মীয় বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করা হয়নি, অথবা বিশেষ কোন কর্তৃত্বের কথাও বলা হয়নি। রুমী শুধু চেয়েছেন যাতে আমরা দেখি যে এর মাঝে আসলে কি রয়েছে, তিনি চেয়েছেন আমরা যাতে আবেগের দিক থেকে সৎ থাকি এবং অবয়ব দ্বারা বিমোহিত না হই। অন্য কথায় ফুলদানির সৌন্দর্য্যে খুব বেশি আকৃষ্ট হয়ো না, এটি শুধু মাত্র গোলাপকে ধারণ করার জন্য। একই সময় ‘ফিহি’ আল্লাহকেও উল্লেখ করে। অতএব, আল্লাহ হচ্ছেন যিনি আল্লাহ। এটি মুসলমানেরা সব সময় কালিমা তাইয়্যেবাহ উচ্চারণ করে যাকে ‘আল্লাহ ছাড়া কোন রব নেই, তার অনুরূপ। অন্য কথায়, রুমী প্রশ্ন করেন, “এর চেয়ে আর বেশী কি বলার আছে?” সকল শব্দ, সকল কাহিনী এবং ব্যাখ্যায় এর চেয়ে বেশি কিছু বলা হয়নি। বাস্তবতার বড় বাস্তবতা আর কিছু নেই। আল্লাহ আছেন, বাস্তবতাও আছে। ‘ফিহিকে মা ফিহি’তে ব্যাখ্যা করা কঠিন, শব্দ দিয়ে প্রকাশ সম্ভব নয়।


‘রুমীর সংলাপ’ গ্রন্থে অনুবাদক ভূমিকায় অতি সুন্দরভাবে মূল গ্রন্থের বিষয় সম্পর্কে পাঠকের জন্য অতি চমৎকারভাবে বলেছেন, “রুমী শুধুমাত্র শিক্ষণীয় কাহিনী বর্ণনা করেননি অথবা তার দার্শনিক ও ধর্মীয় উপলব্ধিকে তুলে ধরেননি, বরং তার ব্যবহৃত শব্দাবলী যে মর্ম বোঝাতে চেয়েছে তাই তুলে ধরেছেন। সুফীরা যেমন প্রায়ই বলে থাকেন, বাহিরে থেকে এই বিষয়গুলো উপলব্ধি করা যায় না, বরং ভিতর থেকে আবিষ্কার করতে হয়। সন্দেহ নেই যে এ ধরনের বক্তব্য মতানৈক্য সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদেরকে রুমীর নিজস্ব সংলাপের প্রতি লক্ষ্য করতে হবে এ ব্যাপারে তার মতামত জানার জন্য। রুমী তাদেরকে বারবার সমালোচনা করেছেন, যারা বাইরে থেকে কোন কিছুকে দেখে এবং অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়।


এটাই সম্ভাব্য যে রুমীর সংলাপ শুধুমাত্র তাদের ক্ষেত্রেই আবেদন রাখবে, যারা তার শব্দ যথার্থভাবে বুঝতে চেষ্টা করবে। কিন্তু পাঠক যদি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তার কবিতা পাঠ করতে চান তাহলে তারা নিজেদের জীবনের সাথে রুমীর সম্পর্ক খুঁজে পাবেন এবং প্রেমের পথের সাথে তার মাদকতাময় ঘনিষ্ঠতার সন্ধান লাভ করবেন।”


‘রুমীর সংলাপ’ গ্রন্থের প্রতিটি পাতায় পাতায় রুমীর জ্ঞানের গভীরতার পরিপূর্ণ বর্ণনা বিরাজমান। সকল মানুষ সহজ মনে, সহজ অর্থে রুমীর সংলাপর বিষয় উপলব্ধি করা কঠিন। তাই পাঠকে রুমীর চিন্তার গভীরতায় প্রবেশ করতে হবে। বুঝতে হবে। পড়ে পড়ে চিন্তা করতে হবে।
রুমীর সংলাপ গ্রন্থের চৌষটিতে যে বক্তব্য দিয়ে হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী (রঃ) পাঠকের উদ্দেশ্যে বলেন তা তোলে ধরে রুমীর সংলাপ গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষ করছি। রুমী বলেন, “এ পৃথিবীতে গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে লব্ধ প্রতিটি বিজ্ঞানই দেহ বিষয়ক বিজ্ঞান। মৃত্যুর দ্বারা অতিক্রম করে অর্জিত যে বিজ্ঞান সেটি হচ্ছে আত্মার বিজ্ঞান। ‘আমি আল্লাহ’ এই বিজ্ঞান সম্পর্কে জানা হচ্ছে দেহের বিজ্ঞান। কিন্তু ‘আল্লাহ হওয়া’ হচ্ছে আত্মার বিজ্ঞান। প্রদীপের আলো ও আগুন দেখা দেহের বিজ্ঞান, আর সেই প্রদীপের শিখার প্রজ্বলিত হওয়া আত্মার বিজ্ঞান। যা কিছু অভিজ্ঞতা দ্বারা অর্জিত হয় তা আত্মার বিজ্ঞান, আর যা কিছু জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে অর্জিত তা দেহের বিজ্ঞান।”


অপরূপ ভাষা শৌলে সমৃদ্ধ ‘রুমীর সংলাপ’ গ্রন্থটি বাংলা ভাষাবাসীদের জন্য একটি অসাধারণ অনুবাদ গ্রন্থ। যা সব সময় হৃদয়কে আন্দোলিত করে, মোহিত করে। যেমন রুমী তার সংলাপ একাত্তরে বলেন, “ডানাসহ পাখি এবং আল্লাহর প্রেমিকদের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, পাখি সব সময় একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে উড়ে যায়। আর আল্লাহর প্রেমিকেরা তাদের আকাক্সক্ষা বা ইচ্ছার ডানায় ভর করে উড়ে যায সকল দিকে।”

The post ‘রুমীর সংলাপ’ হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী (রঃ) অসাধারণ সৃষ্টি appeared first on চিন্তা ভাবনা.

]]>
https://chintavabna.com/jalaluddin-rumi/feed/ 0