Private Universities of Bangladesh

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৫ (খসড়া)
অবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক

Image Source : thedailycampus.com

বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ২০১০ অনুযায়ী দেশে ১১৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সরকার অনুমোদন দিয়েছেন। উক্ত আইনের মাধ্যমে সৃষ্টভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ পরিচালিত হয়ে আসছে। তাতে কারো কোনো অসুবিধা আমরা দেখছি না। কিন্তু কোনো উর্বর মস্তিষ্কের চিন্তা থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ সম্পূর্ণ রুপে বাদ দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৫ (খসড়া) গেজেট আকারে জারি করার জন্য বর্তমান অন্তবর্তী সরকার উদ্যোগ নিয়েছেন। অদ্ভুত এই আইনের ধারাসমূহ কিছুটা আলোচনা করলে পাঠক বুঝতে পারবেন, একটি হীন উদ্দেশ্যে এই কালো আইন করার উদ্যোগকে আমরা প্রত্যাখান করি এবং দাবি করছি অবিলম্বে সরকার এই অশুভ উদ্যোগ বন্ধ করুন। এমনিতে দেশের শিক্ষাখাত নানা সমস্যায় জড়িত। সরকার কোন কমিশনও গঠন করেন নাই। নানা বিষয়ে মোট ১৪টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। অথচ জরুরি বিষয় শিক্ষাকে উপেক্ষা করা হয়েছে।

এই প্রবন্ধে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২৫ (খসড়া) কিছু কিছু ধারা নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো।

এক) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৫ এর ৯ ধারায় বলা হয়েছে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের লক্ষ্যে ৭ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটির সভাপতি থাকবেন মঞ্জুরী কমিশনের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধ্যাপক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের একজন প্রতিনিধি, যিনি যুগ্ম সচিবের নিচে নয়, একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বা অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে প্রবীণ অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয় এসোসিয়েশনের সভাপতি/জেনারেল সেক্রেটারী, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান মনোনীত দুইজন সদস্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্টার উক্ত কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন।
শিক্ষানুরাগীগণ নিজস্ব অর্থায়নে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করবেন। আর তার উপাচার্য, উপ-উপাচার্য কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের চেয়ারম্যান হবেন সরকারি আমলা তথা কমিশনের একজন সদস্য। থাকবেন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য, থাকবেন সরকারী আমলা আরও থাকবেন এসোসিয়েশনের সভাপতি/সেক্রেটারী। উদ্ভুত এই প্রস্তাব তখন কি এই প্রতিষ্ঠান আর বেসরকারি থাকবে? আর উদ্যোক্তাদের আগ্রহ আর থাকবে না। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উন্নতির গতি হারিয়ে যাবে।
আবার তিন জনের একটি প্যানেল জমা দিতে হবে। কেন তিনজনের প্যানেল। ২০১০ আইনে এই সকল বিষয় ছিল না। প্রয়োজনও হয়নি। প্যানেল কেন করতে হবে। পূর্বের নিয়ম অনুযায়ী ট্রাস্টি বোর্ড শুধুমাত্র ১ জনকে মনোনীত করে অনুমোদনের জন্য পাঠাবেন।

দুই) ধারা ১৩: উপাচার্য
উক্ত ধারায় বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি নতুন শর্ত যুক্ত করা হয়েছে কোন বিশ্ববিদ্যালয় ১০ বছর প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসহ ২০ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। Scopus ইনডেক্স জার্নালে মোট কমপক্ষে ৫টি , মোট উদ্বৃতি (Citation) কমপক্ষে ২০০টি, আর্ন্তজার্তিক সহযোগিতার সংখ্যা নূন্যতম ৫টি, স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজের সংখ্যা ৫টি, গুগল স্কলার এবং অভিজ্ঞ একাউন্ট থাকতে হবে।
উল্লেখিত শর্ত সমূহ একজন উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য বা ট্রেজারার হওয়ার জন্য অতিরিক্ত, অপ্রয়োজনীয়। উপাচার্য বা উপ-উপাচার্য একজন প্রশাসক। প্রশাসনিক যোগ্যতার বিশেষ প্রয়োজন। দক্ষতার সাথে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করাই একজন উপাচার্যের মূল কাজ । এই সকল শর্ত না রাখাই যুক্তিযুক্ত।

তিন) ধারা ১৯, সিন্ডিকেট গঠন সম্পর্কে নতুন আইনে বলা হয়েছে : প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় একটি সিন্ডিকেট থাকবে। তাতে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ বোর্ড অব ট্রাস্টি কর্তৃক একজন নারীসহ তিনজন সদস্য, উপাচার্য কর্তৃক একজন নারীসহ তিনজন সদস্য সরকার কর্তৃক মনোনীত একজন অধ্যাপক, শিক্ষার্থী কল্যান উপদেষ্টা, তিন জন অ্যালামনাই সদস্য।
এই ধারায় দেখা যাচ্ছে নারীসহ সরকার ও কমিশনসহ চারজন নতুন করে যুক্ত হলেন।
তবে এই ধারায় নারীসহ সংযুক্ত বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এইটি জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণে সহযোগ হবে।

চার) ধারা ২৩, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো সরকারি বেতন স্কেলের অন্যূন ২০% এর বেশি হইবে। এই সংযোজন অন্যায় হস্তক্ষেপ। স্বাধীনতার উপর চরম নজরদারী।

চার) ধারা ২৯, অর্থ কমিটি : বিশ্ববিদ্যালয় কোষাধ্যক্ষকে অর্থ কমিটির সভাপতি প্রস্তাব করা হয়েছে। তিনি কর্মকর্তা। ট্রাস্টি নন। এই কমিটির সদস্য হবেন, উপ-উপাচার্য, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ কর্তৃক একজন নারীসহ দুইজন, উপ-উপাচার্য কর্তৃক একজন, সিন্ডিকেট কর্তৃক নারীসহ দুইজন, বিশ্ববিদ্যালয় এ্যালামনাই কর্তৃক ১ জন। পরিচালক (অর্থ) সদস্য সচিব হবেন।
২০১০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনের সভাপতি অর্থ কমিটিতে ট্রাস্টি থেকে ছিলেন। প্রস্তাবিত কমিটিতে অতিরিক্ত বহিরাগত সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যাদের অর্থ সংগ্রহ বা জোগানে কোন ভূমিকা থাকবে না। তা হলে বিশ্ববিদ্যালয় অর্থ জোগান ভাটা পড়বে এবং উন্নয়ন কর্মকান্ড ব্যহত হবে।
এই কমিটিতে একজন নারী সদস্য রাখার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে ৩২ ধারায় ও একজন নারীসহ দুইজন সদস্য রাখতে হবে যারা ট্রাষ্ট্রি সদস্য নন। কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগে এই ক্ষেত্রেও বহিরাগত সদস্যদের প্রাধান্য পেয়েছে। নিয়োগ বাণিজ্য ঠেকানোর ব্যবস্থা এই ক্ষেত্রে কঠিন হবে।

পাঁচ) ধারা ৪১ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থের উৎস : এই ধারায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আয়ের উৎসের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক বা কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋ ঋন নেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফি থেকে অর্থ দিয়ে কোন মানসম্মত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা যায় না। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিতে হবে। এই বিষয়টি সুস্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

ছয়) ধারা-৪৪, শিক্ষার্থী ফি :
এই ধারায় শিক্ষার্থী ফি কাঠামো প্রস্তুত করে কমিশনের অনুমোদন গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বেসরকারি ভাবে প্রতিষ্ঠাতাগণ ছাত্রছাত্রীদের ফি নির্ধারণ করবেন। যেহেতু সরকার কোন অনুদান দেন না, তাই ফি নির্ধারনের জন্য সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের ফি উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারণ করে থাকে। সেই ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন পড়ে না।

পাচ) ধারা-৫০, চাকরি প্রবিধানমালা :
এই ধারায় ২নং উপ ধারায় বলা হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উহার শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন কাঠামো ও চাকরি প্রবিধানমূলক কমিশন থেকে অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে। স্বাধীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন কমিশন থেকে উক্ত বিষয় অনুমোদন নিতে হবে? বিষয় শুধু অবহিত করা যাবে মর্মে থাকাটা উচিত।

ছয়) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৫ (খসড়া) : কোথাও উল্লেখ নাই যে, উক্ত বিশ্ববিদ্যালয় লাভজনক বা অলাভজনক হবে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছিলাম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এর মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় লাভজনক বা অলাভজনক উভয়6 ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা যাবে। তাতে প্রতিষ্ঠাতাগণ নিজেদের ইচ্ছা মোতাবেক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে থাকবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে উভয় প্রকারের বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে।
আমাদের দেশে শুরু থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে স্থাপিত হয়েছে। ১৯৯২ সালের আইনের কোন বাধা ছিল না। ২০১০ আইনে অলাভজনক উল্লেখ করা হয়েছে। লাভজনক না হওয়ার কারণে উদ্যোক্তাগণ নতুন কোন বিনিয়োগ করেন না। নতুন বিনিয়োগ না করলে বিশ্ববিদ্যালয় উন্নতমানে পৌছানো কোনক্রমেই সম্ভব নয়। শুধু ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজ করা যাচ্ছে না। তাই অনেক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আর্থিক দৈন্যতায় ভুগছে। লেখাপড়ার মানও উন্নত হচ্ছে না।
নানা অনিয়মের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোক্তাগণ জড়িয়ে পড়ছেন। লাভজনক হলে উদ্যোক্তাগণ নতুন নতুন বিনিয়োগ করতেন। লাভের আশায় বিনিয়োগে উৎসাহ থাকতো। কিন্তু তা না থাকার কারণে অনেকে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাত্রায় নিয়ে শিক্ষা খাতকে কলুষিত করছে।

সাত) বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০২৪ (খসড়া) পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, তবে কোন ভাল দিক নেই। বরং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ সকলের জন্য গ্রহণযোগ্য, উপযোগী ও আধুনিক। তাই প্রস্তাবিত খসড়া আইন বাতিল করা হোক।
শুধুমাত্র দুইটি ধারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এ সংযুক্ত করলে আরও আধুনিক ও উন্নত হবে।

১. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অলাভজনক ও লাভজনক উভয় ভিত্তিতে পরিচালিত হতে পারবে।
২. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য যে কোন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ গ্রহণ করতে পারবে।

Abul Quasem Haider
আবুল কাসেম হায়দার

সাবেক সহ সভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ, বিজিএমইএ , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:, অষ্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তিনি আজীবন সদস্য : এশিয়াটিক সোসাইটী বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমী, চট্টগ্রাম সমিতি, সন্দ্বীপ সমিতি ঢাকা ।

লেখক দৈনিক আজকের আওয়াজ ও সাপ্তাহিক প্যানোরামা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments