গণতন্ত্রের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আজ আমাদের মাঝে নেই। দেশনেত্রী খালেদা বিদায় নিয়েছেন ডিসেম্বর ২০২৫। কিন্তু তার কর্ম, তাঁর আদর্শ, তাঁর অনুসরণ করার মত নানা কর্মকা- আমাদের মাঝে বিরাজমান। পুরো জাতি আজ তাকে স্মরণ করছে। এই জাতির অভিভাবক ছিলেন, আছেন, থাকবেন। তাঁর সুন্দর কর্মময়, অনুকরণীয় কাজসমূহ আমাদের হৃদয়কে আলোড়িত করছে, ভবিষ্যতেও করবে।
গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য খালেদা জিয়ার আন্দোলন। জীবনের শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত তিনি জনগণের কাজ করে গিয়েছেন। তাই তিনি বলতেন, ‘বিদেশে আমার কোন ঠিকানা নেই, আমার ঠিকানা এই প্রিয় বাংলাদেশ।’ জেল, জুলুম, নির্যাতন সব সহ্য করে তিনি মৃত্যু অবধি বাংলাদেশে ছিলেন। এক মুহূর্তের জন্যও তিনি দেশের মানুষকে ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান নাই। তাই তো তিনি সকলের নেতা। তিনি জনমানুষের প্রিয় নেতা।
বেগম জিয়া শুধুমাত্র গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেন নাই, তিনি দেশের অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তি রচনা করে গিয়েছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর দেশের শাসন ভার গ্রহণের মাধ্যমে দেশে নতুনভাবে স্বাধীন করে, দেশ অপশাসন ও একদলীয় শাসন থেকে মুক্ত করে বহু দলীয় গণতন্ত্রের ধাপে উন্নীত করেন। এবং সাথে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উন্নয়নের সিঁড়িতে নিয়ে আসেন। সেই দীর্ঘ ইতিহাস বেগম খালেদা জিয়ার শাসনকাল অতিব গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, বিশেষ করে অর্থনৈতিক সংস্কার ও নীতিগত পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে।
এক
বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরাচার শাসকের পতনের পর ১৯৯১ সালে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর নেতৃত্বকালে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামো থেকে বের হয়ে বাজার ভিত্তিক, রপ্তানি নির্ভর উন্নয়ন মডেলের দিকে অগ্রসর হয়। এটি শুধুমাত্র নীতিগত পরিবর্তনের বিষয় ছিল, বরং এটি ছিল রাষ্ট্র, বাজার ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এই সময় অর্থনীতির মূল হাল ধরেছিলেন সাইফুর রহমান। তাঁর হাত ধরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দেশ অর্থনীতিতে নতুন গতি লাভ করে।
দুই
১৯৯০ আন্দোলনের পর স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটে। বাংলাদেশ সদ্য সামরিক শাসন থেকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে। তখন খুবই সীমিত, উৎপাদন ক্ষমতা ছিল খুবই সামান্য, রাজস্ব অবকাঠামো ছিল দুর্বল, নানা নিয়ন্ত্রণ নীতিতে রাজস্ব কাঠামো আবদ্ধ ছিল। এই বাস্তবতায় খালেদা জিয়া এটি নতুন ও ভিন্ন পথ আবিষ্কার করেন। তিনি বেছে নেন ব্যক্তি খাতকে উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। বাজারের ভূমিকা বৃদ্ধি করা, বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ তৈরি করা এবং রাষ্ট্রকে সরাসরি নিয়ন্ত্রকের পরিবর্তে সহায়ক শক্তি হিসেবে গড়ে তোলাই ছিল এর মূল দর্শন। এই সময় থেকে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি দৃশ্যমান হতে শুরু করে।
তিন
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের মূল চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প খাত। যদিও এ শিল্পের সূচনা হয় আশির দশকের থেকে, তবে নব্বই দশেক এসে এই শিল্প কাঠামোগত সহযোগিতা লাভ করে। সরকারের পক্ষ থেকে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা, ব্যাক টু ব্যাক এলসি, নগদ প্রনোদনা এবং বাণিজ্যিক সহজীকরণের নীতির মাধ্যমে রপ্তানিকারকদের কার্যকর সহযোগিতা প্রদান করা হয়। এই নীতিগুলো কোন উচ্চাভিলাষী শিল্প কৌশল ছিল না, বরং বাস্তব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান ছিল, এর ফলে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক শিল্পে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। বেগম খালেদা জিয়ার শাসন আমলে তৈরি পোশাক শিল্পখাত থেকে জাতীয় অর্থনীতিতে ৭৫ শতাংশের অধিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়।
চার
বাংলাদেশের ইতিহাসে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন প্রবর্তন একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর পরই বেগম জিয়া সাইফুর রহমানের নেতৃত্বে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন আইন প্রণয়ন করেন। এটি বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাপনায় একটি মৌলিক রূপান্তর। সীমিত ও অকার্যকর কর ব্যবস্থা থেকে একটি আইকনিক বিস্তৃত ভিত্তির রাজস্ব ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ভ্যাট চালু, একটি অসাধ্য সাধন কাজ ছিল। বাধাও এসেছে। পরবর্তীতে অনেক সংস্কারও করা হয়েছে। তবুও ভ্যাট ব্যবস্থা চালু হয়েছে। দেশের রাজস্ব ও প্রশাসনের ভিত্তি শক্তিশালী করা হয়েছে। তখন দেশের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগের জন্য এ ধরনের কাঠামোগত সংস্কার খুবই জরুরি ছিল।
পাঁচ
বাংলাদেশের ইতিহাসে একজন আপসহীন ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি কেবল গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক নন, বরং বাংলাদেশের আধুনিক বাজারভিত্তিক অর্থনীতির অন্যতম রূপকার। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় তিনি স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। তিনি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ভি গড়েছিলেন। এক্ষেত্রে তার অবিচল নিষ্ঠা, দূরদর্শিতা আর যুগান্তকারী দিক-নির্দেশনা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
খালেদা জিয়ার আমলে ১৯৯৪ সালে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট কনভার্টি বিলটি চালু হয়, যা আমদানী-রপ্তানী কার্যক্রম আরও বেশি গতিশীলতা লাভ করে। ২০০৩ সালে খালেদা জিয়ার সরকার ভাসমান বিনিময় হার ব্যবস্থা চালু করে। এটি বৈদেশিক বাণিজ্য ও মুদ্রানীতিতে নমনীয়তা আনে এবং বহির্বিশে^র সঙ্গে অর্থনৈতিক সংযোগকে আরও কার্যকর করে তোলে।
ছয়
বেগম জিয়ার আমলে আর্থিক খাতের সংস্কার ছিল অন্যতম জটিল ও কঠিন কাজ। ব্যাংক কোম্পানী আইন ১৯৯১ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩ প্রণয়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এই সময় বিশ^ব্যাংক সহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে আর্থিক খাতের সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এই সংস্কারের উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি, ঋন শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা এবং তদারকি শক্তিশালী করা। যদিও পুরোপুরি সফলতা আসে নাই, তবে মূল বিত্তি রচিত হয়েছিল।
বেগম খালেদা জিয়ার শাসন আমলে পুঁজি বাজারের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ইঝঊঈ) গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা পুঁজিবাজারকে কাঠামোগত ভিত্তি তৈরিতে অধিক সাহায্য করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে শেখ হাসিনার আমলে পুঁজিবাজারকে পরিকল্পিতভাবে লুন্ঠনের মাদ্যমে তলানিতে নিয়ে যাওয়া হয়।
সাত
বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সংযোজন ছিল পরিকল্পিত ও দূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। নব্বই দশকে অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশকে এনালগ পন্থা থেকে কিবোর্ডনির্ভর ডিজিটাল প্রযুক্তির পথে এগিয়ে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বেগম খালেদা জিয়ার সরকার। সাবমেরিন সংযোজন, রাষ্ট্রীয় মোবাইল টেলিটক প্রতিষ্ঠা, আইটি সেক্টরকে থ্রাস্ট মেকীর ঘোষণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামো তৈরি মধ্য দিয়ে আজকের প্রযুক্তি নির্ভর বাংলাদেশে তথ্য ও বিজ্ঞান প্রযুক্তি খাতের ভিত্তি। এই ভিত বেগম জিয়া গড়ে দিয়েছিলেন বলে আহকের প্রযুক্তি খাতের এই উত্থান ও উন্নতি।
আট
বেগম জিয়া সরকবারের আমলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। নব্বই দশক থেকে ২০০০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে দারিদ্রের হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। তবে এই অর্জন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল। একক কোন সরকারের নয়। তবে খালেদা জিয়ার সরকার রাজনীতি স্থিতিশীলতা এই প্রক্রিয়াকে দ্রুত এগিয়ে নেয়।
নয়
অর্থনৈতিক কর্মকা-ের পাশাপাশি বেগম খালেদা জিয়া নারী উন্নয়নে, নারীর শিক্ষা ও কর্ম সংস্থানে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি নারীদের জন্য ১৯৯৪ সালে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি ও শিক্ষা অব্যাহত রাখার ফলে মেয়েদের বিদ্যালয় অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে। মেয়েদের বিনামূল্যে বইসহ বেতন, ভাতা মওকুফের ফলে নারী শিক্ষায় বিপ্লব সাধিত হয়।
দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে প্রমাণ কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ধীরে ধীরে বৃদ্ধি করিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তা জোরদার করার চেষ্টা করা হয়। এই সকল উদ্যোগ বাংলাদেশের সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
দশ
১৯৯৪ সালে খালেদা জিয়া ঔষধ শিল্পের সংস্কারের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর ফলে আজ ঔষধ শিল্প শক্তিশালী ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। ঔষধ বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে।
মৃত্যুর ৮-৯ বছর পূর্বে খালেদা জিয়া দেশ সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যখন কেউ সংস্কারের কথা চিন্তাও করেনি, তখন খালেদা জিয়া ভিশন ২০৩০ জাতির সামনে তুলে ধরেন। তারপর তারেক রহমান তার ভিত্তিতে, শহীদ জিয়ার ১৯ দফার আলোকে ৩১ দফা জাতির সংস্কারের মৌলিক বিষয় উপস্থাপন করেন। আগামী দিনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ৩১ দফার আলোকে দেশে আর্থ-সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এগিয়ে যাবে। এই অভিপ্রায় আমাদের মনের মধ্যে লালিত থাকবে। সেই সুন্দর, সুদিনের অপেক্ষায় পুরো জাতি প্রহর গুনছে। খালেদা জিয়ার বাংলাদেশে তার স্বপ্নকে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে তরুণ প্রজন্ম। যা চব্বিশে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে।

আবুল কাসেম হায়দার
সাবেক সহ সভাপতি এফবিসিসিআই, বিটিএমইএ, বিজিএমইএ , বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি, প্রতিষ্ঠতা চেয়ারম্যান ইস্টার্ন ইউনির্ভাসিটি ও ইসলামিক ফাইন্যান্স এন্ড ইনভেস্টমেন্ট লি:, অষ্ট্রেলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, আবুল কাসেম হায়দার মহিলা কলেজ সন্দ্বীপ, চট্টগ্রাম, সাবেক সিনেট সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
তিনি আজীবন সদস্য : এশিয়াটিক সোসাইটী বাংলাদেশ, বাংলা একাডেমী, চট্টগ্রাম সমিতি, সন্দ্বীপ সমিতি ঢাকা ।
লেখক দৈনিক আজকের আওয়াজ ও সাপ্তাহিক প্যানোরামা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।




